
নিউজ ডেস্ক: বাঁশের ছোট ছোট টুকরো দিয়েই তৈরি আস্ত একটি ডিজেল লোকোমোটিভের মডেল। নিখুঁত কারুকাজে তৈরি সেই রেল ইঞ্জিন এবার জায়গা করে নিল India Book of Records-এ। চন্দননগরের হস্তশিল্পী গণেশ ভট্টাচার্যের তৈরি বাঁশের ‘WDP-4’ মডেল ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে শিল্পীমহলে। শুধু ভারতেই নয়, তাঁর তৈরি এই মডেল ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে দিল্লির ন্যাশনাল রেল মিউজিয়ামেও।
চন্দননগরের গড়েরধারের বাসিন্দা গণেশ ভট্টাচার্য প্রায় ২২ বছর ধরে বাঁশের হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁর এই যাত্রার শুরু রেল ইঞ্জিন দিয়ে নয়। প্রথম দিকে বাঁশ দিয়ে কাপ, ট্রে, ফুলদানি-সহ ছোটখাটো নানা সামগ্রী তৈরি করতেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। একের পর এক তৈরি করেন ভিনটেজ গাড়ি, লরি, ট্রাম, বাস থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।
এরপর রেল ইঞ্জিন তৈরির দিকে বিশেষভাবে মন দেন গণেশ। রেলের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ থেকেই তৈরি হতে থাকে একের পর এক ইঞ্জিনের মডেল। তাঁর তৈরি বাঁশের WDP-4 মডেলটি সেই কাজেরই অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ জাতের অসমিয়া বাঁশ ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে মডেলটি।
কাটারি ও ছুরির সাহায্যে বাঁশকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চেঁছে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়েছে। পরে বিশেষ ধরনের আঠা দিয়ে একের পর এক অংশ জুড়ে তৈরি করা হয়েছে পুরো ইঞ্জিন। এত সূক্ষ্ম কাজ সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছে প্রায় দু’মাস। মডেলটির দৈর্ঘ্য ২২ ইঞ্চি, প্রস্থ ৪.৫ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৯ ইঞ্চি। ‘Smallest Hand Craft of WDP-4’ হিসেবে এই মডেলই জায়গা পেয়েছে India Book of Records-এ।
গণেশের তৈরি শিল্পকর্মের তালিকা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। তাঁর দাবি, WAM4, WDP4D, 677-সহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের রেল ইঞ্জিনের মডেল তিনি তৈরি করেছেন। ব্রিটিশ আমলের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে আধুনিক হাইড্রোজেন ট্রেন—রেলের বিভিন্ন সময়ের মডেল নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর তৈরি বিভিন্ন ধরনের রেল ইঞ্জিনের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বলে জানা গিয়েছে।
এই বাঁশের রেল ইঞ্জিনের স্বীকৃতি পাওয়ার যাত্রাটিও বেশ দ্রুত। ১০ অগস্ট India Book of Records-এর জন্য আবেদন করেছিলেন গণেশ। মাত্র ১৮ দিনের মধ্যেই তাঁর মডেলটি স্বীকৃতি পায় বলে জানিয়েছেন তিনি। এরপর একই মডেল জায়গা করে নেয় Asia Book of Records-এও। এবার তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—Guinness World Records-এর জন্যও আবেদন করেছেন চন্দননগরের এই শিল্পী।
গণেশের শিল্পকর্ম ইতিমধ্যেই দেশের বাইরে নজর কেড়েছে। দিল্লির National Rail Museum-এ তাঁর তৈরি বাঁশের WDP-4 মডেল প্রদর্শিত হয়েছে। শুধু প্রদর্শন নয়, এই মডেলকে কেন্দ্র করে সেখানে একটি কর্মশালারও আয়োজন করা হয়েছিল। এবার নেপালের National Railway Museum-এও তাঁর তৈরি বাঁশের রেল ইঞ্জিন জায়গা পেতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে। কেনিয়া ও নামিবিয়ার রেল মিউজিয়াম থেকেও তাঁর মডেল রাখার প্রস্তাব এসেছে।
এর আগে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও যানবাহনের প্রতিরূপ তৈরি করে নজর কেড়েছেন গণেশ। সংসদ ভবন, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, কলকাতার ট্রাম, দক্ষিণেশ্বর মন্দির, লালকেল্লা থেকে শুরু করে টাইটানিক—বাঁশের টুকরোয় ফুটিয়ে তুলেছেন নানা পরিচিত স্থাপত্য ও যানবাহন।
তবে এত সাফল্যের মধ্যেও গণেশের লক্ষ্য শুধু রেকর্ড তৈরি করা নয়। ভারতীয় রেলের ইতিহাসকে ক্ষুদ্র মডেলের মাধ্যমে ধরে রাখার স্বপ্ন রয়েছে তাঁর। ভবিষ্যতে ১৮৫৩ সাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত ভারতীয় রেলের বিভিন্ন ইঞ্জিনের প্রতিরূপ নিয়ে একটি নিজস্ব সংগ্রহশালা তৈরি করতে চান তিনি।
চন্দননগরের এই শিল্পীর হাত ধরে বাঁশের মতো প্রাকৃতিক উপাদান যে কতটা সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের রূপ নিতে পারে, তাঁর WDP-4 মডেলই তার নতুন উদাহরণ। India Book of Records-এর স্বীকৃতি সেই দীর্ঘ শিল্পযাত্রায় নিঃসন্দেহে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments