Homeকলকাতাযাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতে বেনজির তাণ্ডব! পুড়ল নথিপত্র, ভাঙল নন্দলাল বসুর নকশা করা ঐতিহ্যের প্রতীক, কাঠগড়ায় বহিরাগতরা

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতে বেনজির তাণ্ডব! পুড়ল নথিপত্র, ভাঙল নন্দলাল বসুর নকশা করা ঐতিহ্যের প্রতীক, কাঠগড়ায় বহিরাগতরা

নিউজ ডেস্ক: শিক্ষার পবিত্র অঙ্গন না কি রণক্ষেত্র? গত কয়েকদিন ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘটে চলা ঘটনাবলি দেখে এই প্রশ্নটাই
1787308464511

নিউজ ডেস্ক: শিক্ষার পবিত্র অঙ্গন না কি রণক্ষেত্র? গত কয়েকদিন ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘটে চলা ঘটনাবলি দেখে এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যের বিদ্বজ্জন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে। ছাত্র রাজনীতির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই বিভিন্ন কারণে সংবাদ শিরোনামে থাকে। কিন্তু গত ১৯শে আগস্ট, বুধবার মধ্যরাতে ক্যাম্পাসের ভেতরে যে ভয়ংকর তাণ্ডব, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং নির্বিচার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাসেও এক অত্যন্ত কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর মধ্যে চলা দীর্ঘদিনের মতাদর্শগত বিরোধ এদিন চরম আকার ধারণ করে। যার জেরে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ইতিমধ্যেই সরকারি সম্পত্তি নষ্ট এবং বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশের অভিযোগ তুলে যাদবপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি, এবিভিপি-র পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যাচেষ্টার এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে পুলিশের কাছে।

ঠিক কী কারণে সূত্রপাত হল এই প্রবল অশান্তির? জানা গিয়েছে, ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির (FETSU) একটি সাধারণ সভা বা জেনারেল বডি মিটিং (GBM)। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ পড়ুয়াদের দাবিদাওয়া ও স্বার্থ নিয়ে আলোচনার জন্যই এই সভার আয়োজন করেছিল বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো। কিন্তু গোলমালের আসল সূত্রপাত হয় এই সভার বৈধতা নিয়ে। এবিভিপি-র অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই, তাই কোনো আনুষ্ঠানিক ইউনিয়ন প্রতিনিধির অবর্তমানে বামপন্থীরা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং একতরফাভাবে এই সাধারণ সভা ডেকেছিল। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এবিভিপি নেতৃত্বের দাবি, প্রতিবাদ করার সময় বামপন্থী সমর্থকরা তাদের কর্মীদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় এবং জাত তুলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। অন্যদিকে, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর পালটা অভিযোগ, অরবিন্দ ভবনের সামনে যখন তাদের শান্তিপূর্ণ আলোচনা চলছিল, ঠিক সেই সময়েই এবিভিপি-র কর্মী-সমর্থক এবং একদল বহিরাগত দুষ্কৃতী লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এই পারস্পরিক দোষারোপ এবং হাতাহাতির মাঝেই ক্যাম্পাসে শুরু হয়ে যায় অবাধ লুঠতরাজ ও ভাঙচুর। সবচেয়ে বেশি আঘাত হানা হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর। ক্যাম্পাসের ৪ নম্বর গেটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এমব্লেম বা লোগোটি ভেঙে কার্যত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর নিজের হাতে নকশা করা এই ঐতিহ্যবাহী এমব্লেমের ‘শতদল পদ্ম’ রিংটি উপড়ে ফেলা হয়েছে। শিল্পীর এই অমূল্য সৃষ্টি নষ্ট হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী থেকে শুরু করে বর্তমান পড়ুয়ারা। তাঁদের মতে, এটা শুধু একটা পাথরের লোগো ভাঙা নয়, বরং যাদবপুরের আত্মা এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির গর্বের ওপর এক চরম আঘাত।

তবে তাণ্ডব এখানেই থেমে থাকেনি। আর্টস ফ্যাকাল্টি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (AFSU) অফিস বা ইউনিয়ন রুমেও চলে ব্যাপক ভাঙচুর। অভিযোগ, বহিরাগত দুষ্কৃতীরা জোর করে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর সেখানে থাকা ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং পড়ুয়াদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক ও ইউনিয়ন সংক্রান্ত নথিপত্র টেনে হিঁচড়ে বের করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রশাসনিক ভবন, অরবিন্দ ভবনের বাইরেও চলে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। সেখানে টাঙানো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর একাধিক ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসনিক ভবনের গেট ভাঙার চেষ্টার পাশাপাশি চত্বরে পার্ক করে রাখা বেশ কয়েকটি সাইকেল এবং অন্যান্য জিনিসপত্রও অগ্নিসংযোগের শিকার হয় রাতের অন্ধকারে।

এই হিংসাত্মক তাণ্ডবের সবচেয়ে অমানবিক এবং হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখা যায় ‘আশু-তিমিরের পাঠশালা’র মর্মান্তিক পরিণতিতে। ক্যাম্পাসের ভেতরেই নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষাদানের জন্য পড়ুয়ারা পরম স্নেহে এই অবৈতনিক পাঠশালাটি চালাতেন। হামলাকারীদের রোষানল থেকে রেহাই পায়নি শিক্ষার সেই পবিত্র স্থানটিও। ছোট ছোট শিশুদের হাতে আঁকা নিষ্পাপ ছবি, বর্ণমালার চার্ট এবং পড়াশোনার পোস্টারগুলোও নির্দয়ভাবে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। এই পৈশাচিক ঘটনা প্রমাণ করে দেয়, আক্রমণকারীরা কেবল রাজনৈতিক আক্রোশ মেটাতেই আসেনি, বরং ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা সমস্ত গঠনমূলক ও মানবিক উদ্যোগকেও সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। যাদবপুর শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই ক্যাম্পাসে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষানুরাগী মহল।

পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে রাতেই ক্যাম্পাসে বিশাল পুলিশ বাহিনী প্রবেশ করে। পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও আতঙ্ক কাটেনি। এই বেনজির তাণ্ডবের পর চরম ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। তিনি এই ঘটনাকে “অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত” বলে কড়া ভাষায় নিন্দা করেছেন। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সঠিক পরম্পরা এবং কারা এর পেছনে আসল চক্রী, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করতে ১৯ ও ২০শে আগস্টের সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজ সুরক্ষিত রাখার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন উপাচার্য। এছাড়া ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যের পর ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপাচার্য আরও জানিয়েছেন, ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে ক্যাম্পাসের ভেতরে ২৪ ঘণ্টা পুলিশি পাহারার ব্যবস্থাও করা হতে পারে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল জলঘোলা শুরু হয়েছে। আপাতত গোটা ক্যাম্পাস চত্বরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশি টহল অব্যাহত রয়েছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved