Homeউত্তর ২৪ পরগনাবারাসতবয়স ৬৫ পেরিয়েছে, তবু পড়ানোর নেশায় ছুটে বেড়ান সনৎ স্যর! বিনা পারিশ্রমিকে গড়ছেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার

বয়স ৬৫ পেরিয়েছে, তবু পড়ানোর নেশায় ছুটে বেড়ান সনৎ স্যর! বিনা পারিশ্রমিকে গড়ছেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার

নিউজ ডেস্ক; সকাল থেকে সন্ধে, কখনও আবার গভীর রাত। বুক পকেটে একটি কলম, সঙ্গে পড়ানোর অদম্য তাগিদ। গন্তব্য কখনও হৃদয়পুর,
resizeplus_Screenshot 2026-09-05 122905_edited

নিউজ ডেস্ক; সকাল থেকে সন্ধে, কখনও আবার গভীর রাত। বুক পকেটে একটি কলম, সঙ্গে পড়ানোর অদম্য তাগিদ। গন্তব্য কখনও হৃদয়পুর, কখনও বারাসত, আবার কখনও প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের ভাঙড়। বয়স ৬৫ পেরিয়েছে। তবু পড়ানোর ডাক এলে ক্লান্তি যেন তাঁর কাছে অচেনা শব্দ। দু’টি বাস বদলে, নিজের পকেটের টাকা খরচ করে পোলেরহাট হাই স্কুলে পৌঁছে যান তিনি। বিনিময়ে নেন না কোনও পারিশ্রমিক। কারণ, তাঁর কাছে পড়ানো কোনও ‘প্রাইভেট টিউশন’ নয়। এ তাঁর নেশা, এ তাঁর জীবন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ‘সনৎ স্যর’। ভালো নাম সনৎ কুণ্ডু।

১৯৭৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হয়েই পড়ানো শুরু করেছিলেন সনৎ। তখন একাদশ-দ্বাদশের পড়ুয়াদের পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, অঙ্ক এবং জীববিজ্ঞান পড়াতেন। সময়ের সঙ্গে পড়ানোর বিষয় কমেছে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দায়বদ্ধতা কমেনি। এখন মূলত পদার্থবিদ্যা ও অঙ্ক পড়ান তিনি। তাঁর লক্ষ্য একটাই—অভাব যেন কোনও মেধাবী পড়ুয়ার স্বপ্নের পথে দেওয়াল হয়ে না দাঁড়ায়।

নিজেও মেধাবী ছাত্র ছিলেন সনৎ। সেই যোগ্যতায় রাজ্য সরকারের বস্ত্র দপ্তরে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি পান। কিন্তু চাকরি তাঁর পড়ানোর নেশাকে থামাতে পারেনি। অফিসের দায়িত্ব সামলে সকাল-রাতে ব্যাচ পড়িয়েছেন। জীবনের একটা বড় অংশ কেটে গিয়েছে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। নিজের সংসার করার সময়ও যেন সেই ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে। আজ বারাসতের কলোনি মোড়ের বাড়িতে বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গেই তাঁর সংসার।

তবে সনৎ স্যরের আসল গল্পটা আরও গভীরে। হৃদয়পুরের ‘প্রয়াস’ ক্লাবে নিয়মিত গরিব পড়ুয়াদের পড়ান তিনি। শুধু পড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে খাতা-বই কিনে দিয়েছেন। নোটসের জেরক্স করিয়েছেন। বারাসত থেকে বিরাটি, মধ্যমগ্রাম থেকে হাড়োয়া, ভাঙড় থেকে রাজারহাট—ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী। কোথাও পড়ুয়ারা তাঁর কাছে এসেছে, কোথাও আবার তিনি নিজেই পৌঁছে গিয়েছেন তাদের কাছে।

এ বছর পোলেরহাট হাই স্কুলের এক ছাত্র তাঁর হাত ধরে নিটে সফল হয়ে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। সফল ছাত্র সাকিল তরফদার বলেন, “স্যর আমাকে হাতে ধরে অঙ্ক করিয়েছেন, পদার্থবিদ্যা পড়িয়েছেন। স্যরের জন্যই নিট পাশ করে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছি।” সাকিলের সাফল্য যেন সনৎ স্যরের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রমেরই এক উজ্জ্বল ফল।

ছাত্রী সুনয়না ভট্টাচার্যের কথায়, “স্যরের পড়ানোর ধরন, বোঝানোর ধৈর্য আলাদা। উনি খুব মানবিক।” শুধু বিষয় বোঝানো নয়, পড়ুয়ার সমস্যার জায়গা চিহ্নিত করে ধৈর্য ধরে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন সনৎ। তাঁর কাছে পড়াশোনা মানে শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া নয়, বরং নিজের সামর্থ্যকে চিনে নেওয়া।

পোলেরহাট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সন্দীপ সরকার বলেন, “স্কুলে পদার্থবিদ্যার শিক্ষক না থাকায় অনুরোধ করেছিলাম ওঁকে। এক কথায় রাজি হয়ে যান সনৎ। তারপর থেকে নিজের খরচে, সময় করে নিয়মিত প্রত্যন্ত ভাঙড়ে ছুটে আসেন।” স্কুলের প্রয়োজনের কথা শুনে কোনও পারিশ্রমিকের দাবি না করে এগিয়ে আসা সনৎ স্যরের এই উদ্যোগই তাঁকে আরও আলাদা করে তুলেছে।

সনৎ কুণ্ডুর জীবন যেন মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষকতা সব সময় শুধু চাকরি বা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনও তা হয়ে ওঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরন্তর অঙ্গীকার। নিজের সময়, শ্রম এবং অর্থ খরচ করে যে মানুষটি পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁর কাছে শিক্ষাদানই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সাফল্যই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কেউ ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে, কেউ উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের পিছনে যে মানুষটি নীরবে নিজের সময় দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর নাম হয়তো সব সময় সামনে আসে না। তবু সনৎ স্যর থামেননি। কারণ, তাঁর কাছে পড়ানো মানে শুধু একটি বিষয় শেখানো নয়, একজন পড়ুয়ার ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া।

আজও বয়সের ভারকে পাশে সরিয়ে কলম হাতে ছুটে চলেন তিনি। কখনও হৃদয়পুর, কখনও বারাসত, কখনও ভাঙড়। নিজের সংসারের সীমিত পরিসর পেরিয়ে তাঁর শিক্ষার সংসার ছড়িয়ে রয়েছে বহু দূর। সেই সংসারে জায়গা পেয়েছে অসংখ্য পড়ুয়া, যাদের অনেকের কাছেই তিনি শুধু শিক্ষক নন, স্বপ্নপূরণের পথপ্রদর্শক।

কিছু শিক্ষক শুধু বই পড়ান না—তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের জীবনের পথটাই বদলে দেন। তাই প্রথাগত ভাবে স্কুলের শিক্ষক বা প্রাইভেট টিউটর না হয়েও সনৎ স্যর আর পাঁচ জন স্যরের থেকে আলাদা। তাঁর পড়ানোর মধ্যে রয়েছে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আর সেই কারণেই, ৬৫ পেরিয়েও তিনি হয়ে উঠেছেন বহু পড়ুয়ার কাছে এক অনবদ্য শিক্ষক।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved