
নিউজ ডেস্ক; পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে জাল আধার ও প্যান কার্ড তৈরির চক্র সক্রিয় বলে অভিযোগ করলেন রাজ্যসভার সাংসদ তথা বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি জাল পরিচয়পত্র তৈরির ‘হাব’ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলকে ‘যাতায়াতের করিডর’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এই কারবার যে কোনও মূল্যে বন্ধ করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিজেপির এই নেতা।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বারাসত-টাকি রোডের শিমুলতলায় চাকলা ও কচুয়া ধামের পুণ্যার্থীদের জন্য আয়োজিত একটি সেবাশিবিরে উপস্থিত ছিলেন শমীক। সেখানেই সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর বক্তব্য সামনে আসে। তবে জাল পরিচয়পত্র তৈরির চক্র বা জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের যাতায়াতের বিষয়ে তিনি যে অভিযোগ তুলেছেন, তার সমর্থনে নির্দিষ্ট কোনও তদন্তের তথ্য বা সরকারি পরিসংখ্যান তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে অনুপ্রবেশ এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক চাপানউতোর রয়েছে। রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত করার কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ বা অপরাধমূলক কাজ বন্ধ করতে ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছিলেন। এই লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে বলেও সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছে।
এই আবহেই শমীকের বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তাঁর অভিযোগ, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিকে শুধু যাতায়াতের পথ হিসেবে নয়, জাল আধার ও প্যান কার্ড তৈরির জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরনের কারবার বন্ধ করতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে বলে দাবি করেন তিনি।
শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে জাল আধার ও প্যান কার্ড তৈরির চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাঁর দাবি, ওই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সংগঠিত কারবার গড়ে উঠেছে। তবে এই চক্রের সঙ্গে কারা যুক্ত, কোথায় কোথায় কার্ড তৈরি হচ্ছে, কতগুলি জাল নথি উদ্ধার হয়েছে বা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন—এই বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
জাল পরিচয়পত্র তৈরি বা ব্যবহার করা হলে তা প্রশাসনের কাছে গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। কারণ, পরিচয়পত্রের অপব্যবহার বিভিন্ন ধরনের বেআইনি কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় এমন চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সেবাশিবিরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শমীক আরও অভিযোগ করেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিকে ব্যবহার করে লস্কর-ই-তৈবা এবং আইএসআই-এর মতো সংগঠনের সদস্যরা যাতায়াত করছে। ওই এলাকায় জঙ্গি সদস্যরা স্থায়ী ডেরা গড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ঘটনা, গোয়েন্দা রিপোর্ট বা তদন্তের তথ্য প্রকাশ করেননি।
এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, জঙ্গি কার্যকলাপ এবং বেআইনি পরিচয়পত্র তৈরির মতো বিষয়গুলি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি সংস্থার তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব।
শমীক বলেন, এই কারবার কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তাঁর কথায়, ‘‘এই কারবার যে কোনও মূল্যে বন্ধ করতেই হবে।’’ তাঁর বক্তব্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি স্পষ্ট হয়েছে।
সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়েও তৃণমূলকে আক্রমণ করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল আমলে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে লুটপাট অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। এই লুট বন্ধ করতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ওয়াকফ সংশোধনী বিল আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরোধিতার নামে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু মহিলাদের উপর হামলা, ট্রেনে আগুন এবং হিন্দুদের বাড়ি-সম্পত্তি লুটের অভিযোগও তোলেন শমীক। তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনও তথ্য দেননি। পরে বিষয়টি প্রশাসনিক স্তরের বলে জানিয়ে এ নিয়ে আর মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
সীমান্তবর্তী এলাকায় জাল পরিচয়পত্র তৈরির অভিযোগ নতুন নয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে এলে তার সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে, জাল নথি তৈরির সঙ্গে যুক্ত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বৈধ পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সমস্যাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শমীকের বক্তব্যের পর সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে পরিচয়পত্র তৈরির প্রক্রিয়া, নথি যাচাই এবং নজরদারি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা কতটা, কোনও তদন্ত চলছে কি না, বা প্রশাসনের তরফে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। জাল আধার-প্যান তৈরির অভিযোগের তদন্ত, বেআইনি যাতায়াতের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments