
নিউজ ডেস্ক : ২০২৩ সালের ভয়াবহ তিস্তা বিপর্যয়ের প্রায় তিন বছর পরেও ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবার আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ। কারও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কেউ হারিয়েছিলেন সর্বস্ব। তারপর থেকে কেউ ভাড়া বাড়িতে দিন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ কোনও রকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি সাহায্য পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সেই পরিবারগুলির জন্য এ বার উদ্যোগ নিল প্রশাসন। কালিম্পংয়ে আয়োজিত প্রশাসনিক বৈঠকে ডেকে নিয়ে তাঁদের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তিস্তা অববাহিকায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল। আকস্মিক জলস্ফীতি এবং নদীর তাণ্ডবে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষ করে কালিম্পং এবং তিস্তা সংলগ্ন এলাকায় বহু পরিবার বিপর্যয়ের সরাসরি শিকার হন। বাড়িঘর, জমি এবং অন্যান্য সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বহু মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ছন্দ হারায়।
এর পর রাজ্য সরকারের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, বেশ কিছু পরিবারকে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হলেও একই পরিস্থিতির শিকার অনেক পরিবার সেই তালিকায় জায়গা পাননি। ফলে বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও তাঁদের হাতে কোনও সরকারি আর্থিক সহায়তা পৌঁছয়নি।
ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশের দাবি, তিস্তার বিপর্যয়ের পর তাঁদের জীবন কার্যত বদলে গিয়েছে। অনেকের বাড়ি বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন, কেউ আবার ভাড়া বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সীমিত আয় এবং বাড়তি খরচের কারণে তাঁদের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি সাহায্যের আশায় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আবেদনও জানিয়েছিলেন অনেকে।
এ বার সেই পরিবারগুলিকেই প্রশাসনিক বৈঠকে ডেকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কালিম্পংয়ের প্রশাসনিক কর্মসূচিতে তাঁদের উপস্থিত থাকার কথা। রাজ্য সরকারের তরফে সরাসরি আর্থিক সাহায্য তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সাহায্যের খবর পেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই খুশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি।
তবে কালিম্পংয়ের এই কর্মসূচির পরেই উত্তরবঙ্গের আরও বড় পরিসরের প্রশাসনিক পর্যালোচনায় বসবেন মুখ্যমন্ত্রী। শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান নেওয়ার কথা রয়েছে। জেলা ধরে ধরে প্রশাসনের কাজের অগ্রগতি, প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে রিপোর্ট পর্যালোচনা করবেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই বৈঠকে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির জেলাশাসক-সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকদের সরাসরি উপস্থিত থাকার কথা। উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলার প্রশাসনিক কর্তারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেবেন। ফলে উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলার প্রশাসনিক কাজকর্ম একই বৈঠক থেকে পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে।
প্রশাসনিক মহলের নজরে থাকবে মূলত উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির বর্তমান অবস্থা। কোন জেলায় কোন প্রকল্প কতটা এগিয়েছে, কোন কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি, কোথায় জমি বা প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্প আটকে রয়েছে—সেই সমস্ত তথ্য জেলা ধরে ধরে নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের অধীনে চলা বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করার কথা।
উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি এলাকায় ধস, সমতলে বন্যা এবং বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বছরই বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি জটিল হয়। তাই বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটা, সেই বিষয়েও জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট নেওয়া হতে পারে।
বিশেষ নজরে থাকতে পারে মালদার গঙ্গাভাঙন পরিস্থিতি। বর্ষাকালে গঙ্গার জলস্তর এবং নদীর গতিপথের পরিবর্তনের কারণে জেলার একাধিক এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়। ভূতনি-সহ নদী তীরবর্তী এলাকাগুলির পরিস্থিতি এবং সেখানে প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।
একই ভাবে ডুয়ার্সে ভারী বৃষ্টি এবং নদী সংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতিও প্রশাসনিক বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে অতিবৃষ্টির ফলে নদীর জলস্তর বাড়ার পাশাপাশি ধস এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিপর্যয়ের আগেই উদ্ধার ও ত্রাণের প্রস্তুতি কতটা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
বন্যা, ধস বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার জন্য প্রতিটি জেলার হাতে কী পরিকাঠামো রয়েছে, কোথায় পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম রয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে—সেই তথ্যও নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ত্রাণসামগ্রী মজুত, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিপর্যয়ের সময় বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
অর্থাৎ উত্তরকন্যার বৈঠক শুধুমাত্র উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বর্ষার সময় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একদিকে তিস্তা বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ, অন্য দিকে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়ন ও বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশাসনিক পর্যালোচনা—দুই কর্মসূচিই উত্তরবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলি যেমন নতুন করে আশার আলো দেখছেন, তেমনই জেলার উন্নয়ন প্রকল্প এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশাসনের কাছে কী রিপোর্ট উঠে আসে, সেদিকেও নজর থাকবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments