Homeকলকাতাজ্যোতি বসুর দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে আসেনি’, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে নতুন বিতর্ক

জ্যোতি বসুর দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে আসেনি’, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে নতুন বিতর্ক

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মৃত্যুর ১৬ বছর পর তাঁর মরণোত্তর দেহদান নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক
Screenshot 2026-08-28 162147_edited

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মৃত্যুর ১৬ বছর পর তাঁর মরণোত্তর দেহদান নিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার চক্ষুদান নিয়ে আয়োজিত একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, জ্যোতি বসুর দান করা দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর পর গোটা দেহ দানের পরিবর্তে অঙ্গদানে উৎসাহিত করার আবেদন জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, মরণোত্তর দেহদান এবং মৃত্যুর পর অঙ্গদানের উদ্দেশ্য এক নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দেহদান সাধারণত অ্যানাটমি শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত ও আইনি মানদণ্ড পূরণ হলে মৃত্যুর পর অঙ্গ সংগ্রহ করে তা প্রতিস্থাপনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে দেহদান এবং অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার শঙ্কর নেত্রালয়ের চক্ষুদান সংক্রান্ত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেখানেই জ্যোতি বসুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যে দেহ দান করেছিলেন, সেটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনও কাজে আসেনি। তাঁর বক্তব্য, মৃত্যুর পর যদি ব্রেন ডেথ অবস্থায় অঙ্গদানের মাধ্যমে কিডনি, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্রের মতো অঙ্গ সংগ্রহ করা যায়, তা হলে তা সরাসরি অন্য মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানোর কাজে লাগতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিষয়ক পার্থক্য রয়েছে। ব্রেন ডেথের পর অঙ্গদানকে সাধারণত ‘deceased organ donation’ বলা হয়; এটি জীবিত অবস্থায় করা ‘live donation’-এর থেকে আলাদা। জীবিত ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কিছু অঙ্গ বা অঙ্গের অংশ দান করতে পারেন, সেটি living donation। অন্যদিকে ব্রেন ডেথ ঘোষণার পরে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে শরীরের কিছু অঙ্গ কার্যকর থাকলে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে সেই অঙ্গগুলি প্রতিস্থাপনের জন্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মূলত এই পার্থক্যের দিকটিই তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মস্তিষ্কের কোষে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ ভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী তখন ব্রেন ডেথ ঘোষণা করা হয়। ভেন্টিলেটরের সাহায্যে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালন কিছু সময় সচল রাখা সম্ভব হলে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ সংগ্রহের সুযোগ থাকে।

অন্যদিকে হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাস-প্রশ্বাস স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সেটি কার্ডিয়াক বা ক্লিনিক্যাল মৃত্যুর পর্যায়ে পড়ে। এই অবস্থায় অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা অনেক বেশি সীমিত হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দেহ সংরক্ষণ করে অ্যানাটমি শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যবহার করা হতে পারে। এখানেই দেহদান এবং অঙ্গদানের উদ্দেশ্যের মৌলিক পার্থক্য।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মেডিকেল শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার। তাঁর দাবি, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মানবদেহের অত্যন্ত নিখুঁত থ্রি-ডি ইমেজ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনায় বাস্তব মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজন আগের তুলনায় কমছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় লাইভ বডি ডিসেকশন ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেই যুক্তিতেই সাধারণ মানুষকে গোটা দেহ দানের পরিবর্তে অঙ্গদানের দিকে বেশি করে উৎসাহিত করার আবেদন জানান তিনি। তবে চিকিৎসাশিক্ষায় দেহদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখনও বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি এবং মত রয়েছে। অ্যানাটমি শিক্ষায় বাস্তব মানবদেহের ব্যবহার অনেক প্রতিষ্ঠানেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে সব ক্ষেত্রেই দেহদানের প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছে—এমন বক্তব্য নিয়ে চিকিৎসামহলে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।

জ্যোতি বসুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষে ২০১০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর দেহ ও চোখ দানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর দেহদানকে সে সময় সমাজে দেহদান এবং অঙ্গদানের বিষয়ে সচেতনতা তৈরির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের বহু বছর পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে এখন ফের তাঁর দেহদান প্রসঙ্গ জনসমক্ষে উঠে এল।

দেহদান সাধারণত ব্যক্তির মৃত্যুর পরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে করা হয়। মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের মানবদেহের গঠন সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে ক্যাডাভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক প্রযুক্তি, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, থ্রি-ডি মডেল এবং ডিজিটাল অ্যানাটমিক্যাল প্ল্যাটফর্ম সেই শিক্ষাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব মানবদেহের শিক্ষামূল্য নিয়ে এখনও চিকিৎসাশিক্ষা ক্ষেত্রে আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে অঙ্গদান সরাসরি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। কিডনি, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুসসহ নির্দিষ্ট অঙ্গ উপযুক্ত পরিস্থিতিতে প্রতিস্থাপনের জন্য ব্যবহার করা যায়। তবে কোন অঙ্গ কখন সংগ্রহ করা যাবে, তা নির্ভর করে মৃত্যুর ধরন, অঙ্গের কার্যক্ষমতা, চিকিৎসাগত পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রোটোকলের উপর।

তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর মূল প্রশ্ন উঠেছে—মরণোত্তর দেহদান কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছে, নাকি অঙ্গদান এবং দেহদানের উদ্দেশ্যকে আলাদা করে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত? বিশেষজ্ঞ মহলের আলোচনায় এই বিষয়গুলিই এখন গুরুত্ব পেতে পারে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সাধারণ মানুষকে অঙ্গদানে উৎসাহিত করার যে আবেদন রয়েছে, তার পিছনে মূল লক্ষ্য মুমূর্ষু রোগীদের জন্য প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গের ঘাটতি কমানো। তবে একই সঙ্গে দেহদানও চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণায় ভূমিকা রাখে। ফলে একজন মানুষ মৃত্যুর পরে নিজের দেহ বা অঙ্গ দান করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেহদান এবং অঙ্গদানের পৃথক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।

জ্যোতি বসুর দেহদান নিয়ে করা এই মন্তব্য তাই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পুরনো সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, মেডিকেল শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মৃত্যুর পর মানবদেহের সামাজিক ও চিকিৎসাগত মূল্য নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পর সেই আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved