
নিউজ ডেস্ক; কারও বাবা কাজের সূত্রে ভিন্রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক। দীর্ঘদিন পরিবারের থেকে দূরে থাকার প্রভাব পড়েছে সংসারে। কারও পরিবার ভেঙেছে অভিভাবকের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে। আবার কারও জীবনে শরীর নিয়ে কটূক্তি, বুলিং কিংবা যৌন হেনস্থার অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে গভীর মানসিক চাপ। পরিস্থিতি আলাদা হলেও সমস্যার জায়গাটি অনেক ক্ষেত্রেই এক—অবসাদ, একাকিত্ব এবং সেই অবস্থা থেকে নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা।
এই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বললেন মনস্তত্ত্ববিদেরা। উদ্দেশ্য একটাই—কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ বুঝতে শেখানো, সমস্যার সময়ে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করা।
আলোচনার মধ্যে এক ছাত্রী এমন একটি প্রশ্ন তুলে ধরে, যা উপস্থিত মনোবিদদেরও আশাবাদী করেছে। তার বক্তব্য ছিল, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে ছাত্রছাত্রীরা কি একে অপরকে মানসিক বিপদের সময়ে সাহায্য করতে পারে না? মনোবিদের উত্তর ছিল ইতিবাচক। এমন ভাবনাই আসলে সচেতনতার পরিচয়—বন্ধুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়লে তাকে একা না রেখে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন হলে বড়দের বা পেশাদারদের জানানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোর এমন একটি সময়, যখন শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আবেগ, সম্পর্ক, আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। পরিবারে সমস্যা, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের টানাপড়েন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, শরীর নিয়ে হীনমন্যতা কিংবা অপমান—যে কোনও ঘটনা সেই মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অনেক সময় বাইরে থেকে বিষয়টি সামান্য মনে হলেও কিশোর-কিশোরীর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই শুধু আত্মহত্যা প্রতিরোধের বার্তা দেওয়া যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। মানসিক চাপ, হতাশা বা ব্যর্থতার মুহূর্ত কী ভাবে সামলাতে হবে, সেই দক্ষতা তৈরির উপরও দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। মনস্তত্ত্বের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কোপিং স্কিল’—অর্থাৎ কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনমতো সাহায্য চাওয়ার সক্ষমতা।
জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর ও মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির উদ্যোগে ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস এবং ১০ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন মনোবিদ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। আলোচনায় থাকছে মানসিক চাপ চেনা, উদ্বেগ ও হতাশার সঙ্গে মোকাবিলা, সহপাঠীর সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া এবং প্রয়োজনের সময়ে পেশাদার সাহায্য নেওয়ার মতো বিষয়।
স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিকল্পনায় রয়েছে একটি বিশেষ ট্যাবলোও। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে এই ট্যাবলো সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করবে। একই সঙ্গে প্রচার করা হবে রাজ্য সরকারের টোল-ফ্রি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নম্বর ১৪৪১৬। উদ্দেশ্য, মানসিক সমস্যাকে লুকিয়ে না রেখে প্রয়োজনের সময়ে সাহায্যের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করা।
স্বাস্থ্যকর্তাদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সময়মতো মানসিক সমস্যাকে চিহ্নিত করা। কেউ আচমকা নিজেকে গুটিয়ে নিলে, দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকলে, স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ হারালে কিংবা নিজের ক্ষতি করার মতো কথা বললে বিষয়টিকে হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে তাকে বিচার বা ধমক না দিয়ে মন দিয়ে কথা শোনা এবং প্রয়োজন হলে পরিবারের সদস্য, শিক্ষক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
মনোবিদেরা আরও মনে করছেন, স্কুলের পাঠ্যক্রমে বয়ঃসন্ধি নিয়ে আলোচনা থাকলেও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক পরিবর্তন, আবেগ, সম্পর্ক, শরীর সম্পর্কে ধারণা এবং যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা ও বয়সোপযোগী আলোচনা এখনও যথেষ্ট নয়। ফলে অনেক ছাত্রছাত্রী নিজেদের সমস্যাকে স্বাভাবিক ভাবে প্রকাশ করতে পারে না। সমস্যার কথা বললে পরিবার বা সমাজ কী ভাবে নেবে, সেই ভয়ও কাজ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সন্ধিকালে যৌনতা ও শরীর নিয়ে সঠিক, বৈজ্ঞানিক এবং বয়সোপযোগী শিক্ষা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য, সামাজিক চাপ কিংবা শরীর নিয়ে কটূক্তি অনেক সময় আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে। বুলিং বা হেনস্থার ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীর মানসিক সহায়তার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
আর একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মনোবিদদের—হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়া। প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পাওয়া, সম্পর্কের টানাপড়েন, পরিবারে অশান্তি কিংবা কোনও ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার মতো ঘটনাকে অনেক কিশোর-কিশোরী অত্যন্ত তীব্র ভাবে অনুভব করে। সেই মুহূর্তে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তাই ‘কোপিং স্কিল’-এর প্রশিক্ষণকে এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। মনোবিদেরা ছাত্রছাত্রীদের বোঝাচ্ছেন, কোনও সমস্যা তৈরি হলে তা একা বহন করার প্রয়োজন নেই। বিশ্বস্ত বন্ধু, শিক্ষক, অভিভাবক অথবা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সঙ্গে কথা বলাই হতে পারে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোর রিপোর্টেও দেশে আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের ছবি উঠে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। সেই কারণেই এবার ছাত্রছাত্রীদের শুধু সচেতনতার শ্রোতা হিসেবে নয়, বরং একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে এমন একটি সহায়ক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবেও দেখার চেষ্টা হচ্ছে।
ভাঙড় বালিকা বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ভাঙড় মহাবিদ্যালয়, বোদরা হাইস্কুল এবং বারুইপুর হাইস্কুলেও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্কুল-কলেজের পরিসরেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা এবং সহায়তার পরিবেশ তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
কারণ, মানসিক বিপদের সময় একটি সহানুভূতিশীল কথোপকথনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আর সেই কথোপকথন শুরু করার সাহসটাই তৈরি করতে চাইছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের এই উদ্যোগ—সমস্যা লুকিয়ে নয়, সমস্যার কথা বলে; একা নয়, একসঙ্গে পথ চলার বার্তা দিয়ে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments