Last updated: August 17th, 2026 at 10:52 am

নিউজ ডেস্ক: সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। কখনও ঝিরঝিরে, তো কখনও আবার ঝমঝমিয়ে অঝোর ধারায় নামছে বৃষ্টি। কিন্তু শ্রাবণের এই খামখেয়ালি প্রকৃতি আর লাগাতার দুর্যোগ কি আর ভক্তের আবেগে বাঁধ সাধতে পারে? একেবারেই নয়। বৃষ্টির ভ্রুকুটি আর আবহাওয়া দপ্তরের চোখরাঙানি— সব কিছুকেই যেন রীতিমতো বুড়ো আঙুল দেখালেন আপামর পুণ্যার্থীরা। আর তাই, প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়েই শ্রাবণের শেষ রবিবারে হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী রামরাজার বিসর্জনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় শামিল হলেন হাজার হাজার মানুষ। ছাতা মাথায়, রেইনকোট গায়ে জড়িয়ে, কিংবা স্রেফ বৃষ্টিতে ভিজেই এক অটুট ভক্তি আর বাঁধভাঙা উন্মাদনার সাক্ষী থাকল গোটা মধ্য হাওড়া। প্রায় ৩০০ বছরের সুপ্রাচীন এবং ঐতিহাসিক এই শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে এদিন যেন আক্ষরিক অর্থেই এক আস্ত জনস্রোতে ভাসল গোটা শহর। রামরাজাতলা থেকে শুরু করে গঙ্গার তীরবর্তী রামকৃষ্ণপুর ঘাট পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ পথ জুড়ে চোখে পড়ল শুধু মাথা আর মাথা। উৎসবের এই পুণ্য আবহে এদিন একাকার হয়ে গিয়েছিল ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আধ্যাত্মিকতার হাওড়া।
রামরাজার এই সুবিশাল শোভাযাত্রাকে ঘিরে রবিবার সকাল থেকেই মধ্য হাওড়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় আছড়ে পড়ে মূল রাস্তাগুলোতে। এই বিসর্জনের একটি নির্দিষ্ট এবং প্রাচীন রীতি রয়েছে, যা আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। সেই শতকের পর শতক ধরে চলে আসা প্রথা মেনেই প্রথমে ইছাপুরের দেবী সৌম্যচণ্ডীর সুসজ্জিত বিগ্রহ এসে পৌঁছয় সাঁতরাগাছি মোড়ে। এরপর বাকসাড়া এলাকা থেকে এই বিশাল ধর্মীয় মিছিলে এসে যোগদান করে ছোটো নবনারী ও বড়ো নবনারীর বিগ্রহ। এই সমস্ত ছোট-বড় শোভাযাত্রা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর সবশেষে রাজকীয় মেজাজে বের হয় রামরাজার মূল আকর্ষণীয় শোভাযাত্রা। নতুন রাস্তার মোড়, চক্রবেড়িয়া, নেতাজি সুভাষ রোড, মল্লিক ফটক এবং পি কে ব্যানার্জি রোড হয়ে এই বিশাল মিছিল ধীরলয়ে অগ্রসর হয় গঙ্গার রামকৃষ্ণপুর ঘাটের দিকে। শুধু মূল পুজো কমিটিই নয়, এই বর্ণাঢ্য যাত্রায় শামিল হয়েছিল বিভিন্ন এলাকার ছোটো পুজো কমিটিগুলিও। তারা রাম, হনুমান ও বামনাবতারের সুদৃশ্য বিগ্রহ নিয়ে প্রবল উৎসাহের সঙ্গে এই মিছিলে অংশ নেয়। তবে যেহেতু সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল এবং দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই মাটির প্রতিমাগুলিকে বৃষ্টির হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আচ্ছাদনে ঢেকে রাখা হয়েছিল।
এত বড় মাপের একটি জনসমাগম, তার উপর আবার বৃষ্টির দুর্যোগ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যাতে কোনওভাবেই হাতের বাইরে চলে না যায়, তার জন্য আগে থেকেই আটঘাট বেঁধে ময়দানে নেমেছিল হাওড়া সিটি পুলিশ। ভিড় সামলাতে এবং যানজট রুখতে প্রশাসনের তরফে গ্রহণ করা হয়েছিল কড়া ব্যবস্থা। দুপুরের মধ্যেই রামচরণ শেঠ রোড, শাস্ত্রী নরেন্দ্র গাঙ্গুলি রোড, মহেন্দ্র ভট্টাচার্য রোড এবং নেতাজি সুভাষ রোডের মতো শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত রাস্তাগুলিতে সমস্ত রকম যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সাধারণ মানুষের যাতে যাতায়াতে খুব একটা অসুবিধা না হয়, তার জন্য বিকল্প রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভিড় নিয়ন্ত্রণে রাস্তায় নামানো হয়েছিল কয়েকশো পুলিশকর্মী। পাশাপাশি তাঁদের সাহায্য করার জন্য অতিরিক্ত সিভিক ভলান্টিয়ারদেরও মোতায়েন করা হয়েছিল প্রতিটি মোড়ে মোড়ে। নিরাপত্তার খাতিরে আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমেও সমগ্র শোভাযাত্রার ওপর কড়া নজরদারি চালিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। এই বিশাল আকৃতির প্রতিমার শোভাযাত্রার সময় যাতে কোনওরকম অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা না ঘটে, তার জন্য নির্দিষ্ট রুটে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এছাড়া, পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে জলসত্রেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই বিপুল আয়োজনের সাক্ষী থাকতে এদিন শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই এবং শিবপুরের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ।
হাওড়ার এই রামরাজার পুজোর নেপথ্যে রয়েছে এক সুদীর্ঘ এবং অত্যন্ত বর্ণময় ইতিহাস। কান পাতলে আজও শোনা যায় প্রায় তিন শতাব্দীর পুরনো নানা লোককথা। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৫০ সাল নাগাদ নোনাপুকুর এলাকায় এক কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারের হাত ধরে এই পুজোর শুভ সূচনা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুজো স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসে অধুনা রামরাজাতলায়, এবং তারপর থেকে এই এলাকার নামই হয়ে যায় রামরাজাতলা। এই পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর প্রতিমা। প্রায় ২৬ ফুট উচ্চতার বিশাল আকৃতির রামচন্দ্রের বিগ্রহ। এই রাম সাধারণ রামের মতো নন; তিনি সবুজবর্ণ, তাঁর মুখে রয়েছে বীরত্বব্যঞ্জক গোঁফ এবং পরনে রাজকীয় বেশভূষা। এখানে তিনি ‘রামরাজা’ নামেই পূজিত হন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, একই সুবিশাল কাঠামোয় সীতা, ব্রহ্মা, মহাদেব, সরস্বতী-সহ মোট ২৫ জন দেবদেবীর পুজো একসঙ্গে করা হয়। রামনবমীর পবিত্র দিন থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার মাস ধরে চলে এই পুজো। এরপর শ্রাবণের শেষ রবিবারে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে গঙ্গার ঘাটে হয় বিসর্জন।
এই বিসর্জন শোভাযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি অবাক করা ইতিহাস। ২৬ ফুট উঁচু এই সুবিশাল প্রতিমা যখন রাস্তা দিয়ে যায়, তখন যাতে বৈদ্যুতিক তারে আটকে না যায়, তার জন্য একসময় এই রুটের সমস্ত বৈদ্যুতিক খুঁটির উচ্চতা বৃদ্ধি করার মতো এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আজও রামরাজাতলা থেকে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার পথে সেই উঁচু খুঁটিগুলির দিকে তাকালে সেই প্রাচীন নজিরের প্রমাণ মেলে। আধুনিকতার মোড়কেও ঐতিহ্যের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার এমন অপূর্ব মেলবন্ধন আজও সমানভাবে অমলিন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments