
নিউজ ডেস্ক | NGTVNEWS
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। উত্তরবঙ্গের বক্সা টাইগার রিজার্ভে ফের বাঘের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজ, শুক্রবার ২ অক্টোবর, একটি তিন বছর বয়সি রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনীকে জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশে ‘সফ্ট রিলিজ’ করা হবে। এই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার কথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের। বন দফতর সূত্রে খবর, সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ এই কর্মসূচি হওয়ার কথা।
তবে বাঘিনীকে একেবারে সরাসরি খোলা জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না। প্রথম ধাপে তাকে বক্সার জঙ্গলের মধ্যেই তৈরি করা একটি প্রাকৃতিক ঘেরাটোপে রাখা হবে। সেখানে নতুন পরিবেশ, জলবায়ু, খাদ্য এবং আশপাশের বন্যপ্রাণীর সঙ্গে তার অভিযোজন পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে পরবর্তী পর্যায়ে তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত পরিবেশে বিচরণের সুযোগ দেওয়া হবে।
বক্সার নতুন অতিথি এসেছে বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে। প্রায় তিন বছর বয়সি বাঘিনীটিকে কয়েক দিনের অভিযানের পর ঘুমপাড়ানি গুলির সাহায্যে ধরে রেডিয়ো কলার পরানো হয়। পরে বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে উত্তরবঙ্গে নিয়ে আসা হয়।
বাঘিনীকে প্রথমে সড়কপথে গোরখপুর বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে বিমানে হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে আনা হয়। এরপর কড়া নিরাপত্তায় বন দফতর ও পুলিশের কনভয়ে তাকে বক্সা টাইগার রিজার্ভের নির্দিষ্ট এনক্লোজারে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বন দফতর সূত্রে খবর, বক্সায় পৌঁছনোর পর বাঘিনীর শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। দীর্ঘ যাত্রার পরে প্রথম দিন সে খাবার না খেলেও বৃহস্পতিবার প্রায় ১০ কেজি তাজা মাংস খেয়েছে। এনক্লোজারে হরিণ রাখা হলেও সে সেদিকে এগোয়নি। পরে বনকর্মীরা মাংস দিলে সেটি খেয়ে নেয়।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় তাকে এনক্লোজারের জলাশয়ে একাধিক বার নামতেও দেখা গিয়েছে। তার গতিবিধি সিসিটিভির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বক্সা টাইগার রিজার্ভ একসময় বাঘের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকায় বাঘের স্থায়ী উপস্থিতি কার্যত অনুপস্থিত। সেই পরিস্থিতি বদলাতেই শুরু হয়েছে Tiger Augmentation and Soft Release প্রকল্প।
পরিকল্পনাটি শুধুমাত্র একটি বা কয়েকটি বাঘকে এনে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বক্সায় বাঘের জন্য পর্যাপ্ত শিকারভিত্তি তৈরি করা, আবাসস্থলের উন্নয়ন, বন্যপ্রাণীর চলাচলের করিডর সংরক্ষণ এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুকেই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনার মেয়াদ ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৭-২৮ এবং প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৫০.৮৩ কোটি টাকা।
বন দফতর সূত্রে দাবি, অসম ও ভুটান সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে পুরুষ বাঘের বক্সা এলাকায় যাতায়াতের প্রমাণ ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এই বাঘিনীর সঙ্গে কোনও বন্য পুরুষ বাঘের স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয় কি না, সেটিও নজরে রাখা হবে।
এই কারণেই বাঘিনীকে রেডিয়ো কলার পরানো হয়েছে। তার গতিবিধি, বিচরণক্ষেত্র এবং মানুষের বসতির দিকে তার কোনও অস্বাভাবিক গতিবিধি হচ্ছে কি না—সবই নজরদারির আওতায় থাকবে।
বাঘ একটি শীর্ষ শিকারি। ফলে বক্সায় তার স্থায়ী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে গোটা খাদ্যশৃঙ্খলের উপর। তবে সেই পরিবর্তন নির্ভর করবে পর্যাপ্ত শিকার, নিরাপদ আবাসস্থল এবং বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচলের সুযোগের উপর।
তাই আজকের কর্মসূচিকে শুধু একটি বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার ঘটনা হিসেবে না দেখে বক্সার দীর্ঘমেয়াদি বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাঘিনীকে নতুন পরিবেশে নিরাপদে ছাড়ার প্রস্তুতি এবং তার গতিবিধির উপর নজর রাখার জন্য বক্সা টাইগার রিজার্ভে পর্যটকদের প্রবেশ ও জঙ্গল সাফারিতে সাময়িক বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বিধিনিষেধ ৩ অক্টোবর পর্যন্ত থাকার কথা।
আজকের ‘সফ্ট রিলিজ’ নিঃসন্দেহে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু আসল পরীক্ষা শুরু হবে তার পরেই।
নতুন পরিবেশে বাঘিনী কতটা স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নেয়, নিজের বিচরণক্ষেত্র তৈরি করতে পারে কি না, পর্যাপ্ত শিকার পায় কি না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—মানুষের বসতি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে কি না—তার উপর নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের একাংশ নতুন পরিবেশে পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে স্থানান্তরের ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে বন দফতরের বক্তব্য, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমেই গোটা প্রক্রিয়া এগোনো হচ্ছে।
আজ তাই বক্সার জঙ্গলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। বিহার থেকে আসা এক বাঘিনীকে ঘিরে শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সেই অধ্যায় শেষ পর্যন্ত বক্সায় একটি স্বনির্ভর বাঘের জনসংখ্যা গড়ে তুলতে পারে কি না—তার উত্তর দেবে আগামী কয়েক বছর।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments