
নিউজ ডেস্ক;পুরুলিয়ার কড়াডি মাঠে রবিবার করম পরবতিয়া মহা জড়ুআহির আসর যেন কার্যত হলুদে ঢেকে গিয়েছিল। করম নৃত্যের দলের মহিলাদের শাড়ি থেকে পুরুষদের পোশাক, নতুন প্রজন্মের টি-শার্ট, প্যান্ডেল থেকে তোরণ—সবেতেই চোখে পড়েছে হলুদের আধিপত্য। অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও হলুদ পাগড়ি ও উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানান কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিরা।
করম উৎসবের সেই হলুদ আবহই এখন নতুন করে আলোচনায়। কারণ, কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সঙ্গেও গত কয়েক বছরে এই রংটি বিশেষ ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। তবে কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, আন্দোলনের অনেক আগে থেকেই হলুদ তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্য দিকে, কয়েকটি আদিবাসী সংগঠনের দাবি, হলুদ তাঁদের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিরও প্রতীক। ফলে কুড়মিদের আন্দোলনের সঙ্গে এই রঙের ব্যবহারকে তাঁরা ‘হাইজ্যাক’ হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিরা অবশ্য হলুদের সঙ্গে তাঁদের সামাজিক রীতির সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসের কথাই বলছেন। কুড়মি আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত সুজিতকুমার মাহাতোর ব্যাখ্যা, তাঁদের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েই হলুদের ব্যবহার রয়েছে। শিশুর জন্মের পর নাভির ক্ষতস্থানে হলুদ লাগানোর প্রথার কথা তিনি উল্লেখ করেন। জন্মের কয়েক দিন পর এই রীতি পালন করা হয় বলেও তাঁর দাবি।
শুধু জন্মের সময় নয়, কুড়মি সমাজের বিয়ের বিভিন্ন আচারেও হলুদের ব্যবহার রয়েছে বলে সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও হলুদের উপস্থিতির কথা তাঁরা উল্লেখ করেছেন। পরিবারের কোনও সদস্যের মৃত্যু হলে মৃতদেহে হলুদ মাখানোর রীতি রয়েছে এবং মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের হলুদ না খাওয়ার প্রথাও রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
অর্থাৎ, কুড়মি সমাজের বক্তব্য অনুযায়ী, হলুদ তাঁদের কাছে শুধুমাত্র কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচয় নয়। বরং জন্ম, বিবাহ এবং মৃত্যুর মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক। সেই কারণেই সাম্প্রতিক আন্দোলনে এই রং আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলে তাঁদের দাবি।
পুরুলিয়ার কবি ও গীতিকার সুনীল মাহাতোর ব্যাখ্যাতেও উঠে এসেছে একই সাংস্কৃতিক যোগসূত্র। তাঁর মতে, হলুদের ব্যবহার বহু পুরনো। কুড়মালি গানেও হলুদের উল্লেখ রয়েছে। ফলে কুড়মি সংস্কৃতির সঙ্গে এই রঙের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে বলেই তিনি মনে করেন। সময়ের সঙ্গে আন্দোলন ও রাজনীতির পরিসরে সেই রং আরও বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় আদিবাসী সংগঠনগুলির একাংশ। ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহালের পুরুলিয়া জেলা পারগানা রতনলাল হাঁসদার বক্তব্য, হলুদ তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক। তাঁদের সমাজের উচ্চপর্যায়ের সমাজপতিরাও হলুদ রঙের পাগড়ি পরেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, আগে কোনও আন্দোলনের সঙ্গে এই রঙের এমন ব্যবহার দেখা যেত না; সাম্প্রতিক সময়ে কুড়মি আন্দোলনের সঙ্গে হলুদকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফলে পুরুলিয়ার কড়াডি মাঠে এক দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বৃহত্তর সামাজিক বিতর্ক। একই রংকে ঘিরে দুই সম্প্রদায়ের দুই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। এক পক্ষের কাছে হলুদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সংস্কৃতির অংশ, অন্য পক্ষের কাছে তা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
এই বিতর্কের মধ্যেই রবিবারের অনুষ্ঠানে কুড়মি সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাবিগুলিও সামনে এসেছে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কুড়মি ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার নিয়ে একাধিক বার্তা দেন। কুড়মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
তবে কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি—জনজাতির স্বীকৃতি বা এসটি তালিকাভুক্তির প্রশ্নে ওই মঞ্চে সরাসরি কোনও ঘোষণা করেননি মুখ্যমন্ত্রী। বরং এই বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নবান্নে কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও জানানো হয়েছে। অজিতপ্রসাদ মাহাতো-সহ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বিভিন্ন দাবি নিয়ে কথা হওয়ার কথা।
অজিতপ্রসাদ মাহাতোর নেতৃত্বাধীন কুড়মি সমাজও এখন সেই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে। এসটি তালিকাভুক্তির দাবি তাঁদের আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। করম উৎসবের মঞ্চে সেই দাবির পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয়ের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে কড়াডির করম উৎসব শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হলুদ পোশাক, হলুদ পাগড়ি, হলুদে সাজানো মঞ্চ—সব মিলিয়ে রংটি হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই হলুদ কুড়মি সংস্কৃতির পুরনো ঐতিহ্য, না কি সাম্প্রতিক আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রতীক—তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, পুরুলিয়ার মাটিতে হলুদ এখন সংস্কৃতি, পরিচয় এবং আন্দোলন—তিনটি পরিসরেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments