Homeঅন্যান্যকখনও কুলি, কখনও মালি! পোশাকের আড়ালে যে মানুষটিকে চিনতে ভুলতেন সবাই, তিনিই বিদ্যাসাগর

কখনও কুলি, কখনও মালি! পোশাকের আড়ালে যে মানুষটিকে চিনতে ভুলতেন সবাই, তিনিই বিদ্যাসাগর

নিউজ ডেস্ক;স্টেশনে নেমেছেন এক চিকিৎসক। হাতে ভারী ব্যাগ। চারদিকে তাকিয়ে তিনি ডাকলেন, ‘‘কুলি, কুলি!’’ ডাক শুনে এগিয়ে এলেন এক ব্যক্তি। কোনও কথা না বলে চিকিৎসকের ব্যাগটি তুলে নিলেন তিনি। চিকিৎসকও
resizeplus_eisamay_2026-09-21_otqpwkvx_ishwass

নিউজ ডেস্ক;স্টেশনে নেমেছেন এক চিকিৎসক। হাতে ভারী ব্যাগ। চারদিকে তাকিয়ে তিনি ডাকলেন, ‘‘কুলি, কুলি!’’ ডাক শুনে এগিয়ে এলেন এক ব্যক্তি। কোনও কথা না বলে চিকিৎসকের ব্যাগটি তুলে নিলেন তিনি। চিকিৎসকও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তাঁর হাতে নিজের ব্যাগ তুলে দিলেন। পরে জানা গেল, যাঁকে তিনি কুলি ভেবেছিলেন, তিনি আর কেউ নন—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর!

ঊনবিংশ শতকের বাংলার সমাজসংস্কার, শিক্ষা ও মানবিকতার ইতিহাসে যে নামটি আজও গভীর শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হয়, তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল আশ্চর্য রকমের অনাড়ম্বর। এমনই অনাড়ম্বর যে, তাঁকে দেখে বহু মানুষ প্রথম দর্শনে তাঁর পরিচয়ই বুঝতে পারেননি। কেউ ভেবেছেন কুলি, কেউ মালি, কেউ বা উড়ে বেয়ারা। এমনকি পরিচিতদের মধ্যেও প্রথম দেখায় তাঁকে চিনতে ভুল হয়েছে।

কামার্টীড় রেলওয়ে স্টেশনে—যার বর্তমান নাম বিদ্যাসাগর—ঘটেছিল এমনই একটি ঘটনা। ভারী ব্যাগ হাতে এক চিকিৎসক কুলির খোঁজ করছিলেন। তাঁর ডাক শুনে বিদ্যাসাগরই ব্যাগ বইতে এগিয়ে যান। চিকিৎসক তাঁকে কুলি ভেবে ব্যাগ তুলে দেন। তখন হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, যে মানুষটি তাঁর মালপত্র বহন করছেন, তিনি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক।

‘উড়ে বেয়ারা’ ভেবে ফেলেছিলেন বৃদ্ধা

বিদ্যাসাগরের পোশাক-পরিচ্ছদের অনাড়ম্বরতা নিয়ে এমন আরও অনেক গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। এক বার হুগলিতে স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁকে দেখে এক বৃদ্ধার ভুল ভাঙতে বেশ সময় লেগেছিল। তাঁর ধারণা ছিল, এত সাধারণ পোশাকে কেউ নিশ্চয়ই বড় কোনও ব্যক্তি হতে পারেন না।

বৃদ্ধার আক্ষেপ ছিল, এতক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি নাকি ‘উড়ে বেয়ারা’র অপেক্ষা করেছেন। পরে যখন জানতে পারলেন, যাঁকে এতক্ষণ সাধারণ কর্মচারী ভেবেছিলেন, তিনিই বিদ্যাসাগর, তখন তাঁর ভুল বুঝতে আর বাকি থাকেনি।

আর একটি ঘটনা আরও মজার। এক দিন নিজের বাড়ির বাগানে ঘাস পরিষ্কার করছিলেন বিদ্যাসাগর। সেই সময় কয়েক জন ভদ্রলোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে তাঁদেরও ধারণা হয়েছিল, তিনি বুঝি বাড়ির মালি। তাঁরা যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, সেই বিদ্যাসাগরই যে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তা প্রথমে তাঁদের মাথায় আসেনি।

‘এমন কদাকার পুরুষ বিদ্যাসাগর হতে পারেন না!’

নবীনচন্দ্র সেনের বাড়িতে এক বার বিদ্যাসাগর গিয়েছিলেন তাঁর খোঁজ নিতে। কিন্তু তখন নবীনচন্দ্র বাড়িতে ছিলেন না। তিনি কালীঘাটে গিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর খোঁজখবর নিয়ে ফিরে যান।

পরে নবীনচন্দ্র বাড়িতে ফিরে পরিচারকের কাছে জানতে পারেন, কেউ একজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘‘বিদ্যাসাগর আসেননি তো?’’

পরিচারক অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘এমন কদাকার পুরুষ কখনও বিদ্যাসাগর হতে পারেন না!’’

বাহ্যিক চেহারা নিয়ে সেই পরিচারকের ধারণা যে কতটা ভুল ছিল, তা পরে নিশ্চয়ই তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনাটি বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে বাহ্যিক জাঁকজমকের কোনও সম্পর্কই ছিল না।

গাড়ি নেই, দামি পোশাক নেই

আজকের সময়ে কোনও ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে গাড়ি, পোশাক, জুতো, জীবনযাপন—সবকিছুকেই অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদ্যাসাগরের জীবন ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তাঁর ছিল না আড়ম্বরপূর্ণ গাড়ি। দামি পোশাক বা বিলাসবহুল জুতোর প্রতিও তাঁর আকর্ষণ ছিল না। সাধারণ ধুতি, চাদর, চটি—এই ছিল তাঁর পরিচিত সাজ। হাতে থাকত সাধারণ হুঁকো। তাঁর জীবনযাপনের মধ্যে এমন কোনও উপাদান ছিল না, যা তাঁকে প্রথম দর্শনেই ‘বড় মানুষ’ বলে চিহ্নিত করে দেবে।

শুধু পোশাক নয়, দৈনন্দিন জীবনেও ছিল মিতব্যয়িতা। কোথাও সামান্য সাশ্রয় সম্ভব হলে তিনি তা করতেন। বাদুড়বাগানে সবজির দাম বেশি হলে শিয়ালদায় গিয়ে তুলনামূলক কম দামে কপি কিনতেন—এমন কথাও তাঁর জীবনচরিতের নানা বর্ণনায় পাওয়া যায়।

কোনও জিনিসের মোড়ক বা দড়ি সামান্য কাজে লাগতে পারে মনে হলে সেটিও ফেলে দিতেন না। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে ভেবে রেখে দিতেন। যাত্রাপথে টাকা বাঁচাতে কিছুটা রাস্তা হেঁটে গিয়ে পরে গাড়িতে উঠতেন।

অধ্যক্ষ হয়েও হেঁটে ফিরতেন বীরসিংহ

সংস্কৃত কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু পদমর্যাদা তাঁর জীবনযাপনে কোনও বাহ্যিক পরিবর্তন আনেনি।

গ্রামের বাড়ি বীরসিংহে গেলে তাঁর জীবন যেন আরও বেশি সাধারণ হয়ে উঠত। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে কবাডি খেলতেন। মাঠে তাঁদের সঙ্গে ধান কাটতেও দেখা যেত তাঁকে। কোনও ধরনের দূরত্ব তৈরি করে নিজেকে আলাদা করে রাখার প্রবণতা ছিল না।

কখনও সঙ্গীদের মালপত্র বেশি হয়ে গেলে নিজেই তা মাথায় তুলে নিতেন। তাঁর মতো প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যক্তির কাছে এই আচরণ হয়তো অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের কাছে তা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।

সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পরেও তিনি হেঁটে বীরসিংহে ফিরতেন—এই ঘটনাই তাঁর জীবনদর্শনের একটি বড় পরিচয় বহন করে।

বড় মানুষ হওয়ার অর্থ তাঁর কাছে অন্য রকম

বিদ্যাসাগরের কাছে মানুষের বড়ত্ব সম্ভবত পোশাক, পদ বা সম্পদের মধ্যে ছিল না। তাঁর জীবনের নানা ছোট ছোট ঘটনা থেকে যে ছবিটি ফুটে ওঠে, তা হল—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর কাছে প্রকৃত পরিচয়।

সাহায্য চাইতে আসা বহু মানুষ তাঁর কাছ থেকে আর্থিক বা বাস্তব সাহায্য পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকে সাহায্য পাওয়ার আগেই মুগ্ধ হয়ে যেতেন তাঁর ব্যবহারে। বড় কোনও ব্যক্তির কাছে গেলে যেমন একটা দূরত্ব বা সংকোচ কাজ করে, বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে সেই ভয় দ্রুত কেটে যেত।

কারণ তিনি তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন সহজ ভাবে। তাঁর ব্যবহার ছিল আন্তরিক। সাহায্যপ্রার্থী মানুষ বুঝতে পারতেন, সামনে বসে থাকা ব্যক্তি শুধু একজন প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিত নন—তিনি তাঁদের কষ্ট বুঝতে সক্ষম একজন মানুষ।

চেহারা দিয়ে মানুষকে বিচার করার ভুল

বিদ্যাসাগরের চেহারাও তাঁকে প্রথম দর্শনে ‘প্রভাবশালী’ বলে মনে করার পক্ষে খুব একটা সহায়ক ছিল না। ছোটখাটো গড়ন, কালো বর্ণ, প্রশস্ত কপাল, মুণ্ডিত মস্তক—সব মিলিয়ে তাঁর মধ্যে রাজকীয় বাহ্যিক জৌলুস খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।

কিন্তু মানুষের মূল্যায়ন যদি শুধু চেহারা বা পোশাক দেখে করা হয়, তাহলে বিদ্যাসাগরের মতো মানুষকে চেনার সুযোগই হয়তো হারিয়ে যায়।

বাহ্যিক আবরণ দেখে একটি বইকে যেমন কেউ মূল্যহীন ভেবে সরিয়ে রাখতে পারেন, তেমনই কয়েক পাতা উল্টে তার ভিতরের জ্ঞান ও সৌন্দর্য চোখে পড়লে সেই বইকে আর দূরে রাখা যায় না। বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও যেন একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রথম দেখায় তাঁকে কুলি, মালি বা সাধারণ কর্মচারী মনে হলেও তাঁর কথা, কাজ, জ্ঞান এবং মানবিকতা প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভুল ধারণা ভেঙে যেত।

তাঁর সরলতা কোনও অভিনয় ছিল না। অর্থ বা খ্যাতি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং যত বড় হয়েছেন, ততই সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।

এই কারণেই বিদ্যাসাগরের জীবনের গল্প শুধু একজন সমাজসংস্কারক বা শিক্ষাবিদের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যাঁর মহত্ত্ব পোশাকে নয়, আচরণে; পরিচয়ে নয়, কর্মে; জাঁকজমকে নয়, মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতায়।

No Comments

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved