Homeবীরভূমদড়ি তৈরির সিসাল ফার্মে এ বার সৌরবিদ্যুৎ, ৪৫ একর জমিতে ২১ হাজার প্যানেল! বদলাচ্ছে রাজনগরের ছবি

দড়ি তৈরির সিসাল ফার্মে এ বার সৌরবিদ্যুৎ, ৪৫ একর জমিতে ২১ হাজার প্যানেল! বদলাচ্ছে রাজনগরের ছবি

নিউজ ডেস্ক; এক সময়ে যে জমিতে গড়ে উঠেছিল দড়ি তৈরির জন্য সিসাল চাষের ফার্ম, সেই জমিতেই এ বার তৈরি হচ্ছে বীরভূমের অন্যতম বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে সিসাল
Screenshot 2026-09-14 160624_edited

নিউজ ডেস্ক; এক সময়ে যে জমিতে গড়ে উঠেছিল দড়ি তৈরির জন্য সিসাল চাষের ফার্ম, সেই জমিতেই এ বার তৈরি হচ্ছে বীরভূমের অন্যতম বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে সিসাল বা স্থানীয় ভাষায় ‘কোঙা’ গাছের বাণিজ্যিক ব্যবহার। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সেই ফার্মের জমিই এ বার নতুন করে কাজে লাগছে সবুজ শক্তি উৎপাদনের জন্য। রাজনগরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ একর জমিতে জোরকদমে চলছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কাজ। ইতিমধ্যেই বসানো হয়ে গিয়েছে প্রায় ২১ হাজার সৌর প্যানেল।

একই জমির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বীরভূমের শিল্প ও কৃষির পুরনো ইতিহাস। বিজ্ঞানসম্মত নাম Agave sisalana। সিসাল নামে পরিচিত এই উদ্ভিদকে স্থানীয়রা ‘কোঙা গাছ’ নামেই চেনেন। এক সময়ে এই গাছের পাতা থেকে আঁশ সংগ্রহ করে দড়ি তৈরি করা হত। সেই দড়ির ব্যবহার ছিল জাহাজ ও নৌকাতেও। কিন্তু পরে বাজারে নাইলনের দড়ির ব্যবহার বাড়তে থাকায় সিসালের তৈরি দড়ির চাহিদা কমে যায়। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় সেই পুরনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থাও।

বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে সিসাল ফার্ম

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, সিসাল গাছের পাতাকে বাণিজ্যিক ভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। তাঁর উদ্যোগেই সিউড়ির রাজনগরে সিসাল থেকে দড়ি তৈরির জন্য ফার্ম গড়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে ওই ফার্মের জমিতে সিসাল গাছের চাষ এবং দড়ি তৈরির কাজ চলেছিল।

সিসালের পাতা থেকে পাওয়া শক্ত আঁশ দিয়ে তৈরি দড়ি এক সময় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে জলযান ও বিভিন্ন ভারী কাজে এই দড়ি ব্যবহার করা হত বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু আধুনিক শিল্পে নাইলন-সহ কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় প্রাকৃতিক সিসাল আঁশের তৈরি দড়ির বাজার সংকুচিত হয়।

এর পরেই ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রাজনগরের সেই পুরনো সিসাল ফার্ম। প্রায় ১০০ একর জমি জুড়ে থাকা ফার্মের বিস্তীর্ণ অংশ দীর্ঘদিন তেমন কোনও কাজে ব্যবহার করা হয়নি। এখন সেই পরিত্যক্ত জমিরই একটি বড় অংশ নতুন পরিচয় পেতে চলেছে।

৪৫ একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

ফার্মের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ একর জমিতে তৈরি হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যেই অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। ডব্লিউবিএসডিসিএল-এর রাজনগর সোলার পাওয়ার সাপ্লায়ার প্রকল্পের ম্যানেজার সৈকত মণ্ডলের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে।

ইতিমধ্যেই প্রায় ২১ হাজার সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরেই এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ৩৩ কেভি গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

অর্থাৎ, রাজনগরের এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কোনও একটি নির্দিষ্ট এলাকার বাড়িতে সরাসরি পৌঁছবে না। প্রথমে তা বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হবে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাবস্টেশনের মাধ্যমে সেই বিদ্যুৎ বৃহত্তর সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে পৌঁছবে বিভিন্ন এলাকায়।

সূত্রের খবর, প্রকল্পটি ডব্লিউবিএসডিসিএল-এর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য রয়েছে। রাজ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ বা গ্রিন এনার্জির উপরও গুরুত্ব বাড়াচ্ছে সরকার। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই রাজনগরের পরিত্যক্ত জমির ব্যবহার নতুন করে করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সমস্যায় আশার আলো

বীরভূমের ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী রাজনগর ব্লকে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। তাঁদের বক্তব্য, মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে পড়াশোনা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যায় পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।

রাজনগর, দুবরাজপুর এবং সিউড়ি-১ ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এই প্রকল্প নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের আশা, নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা রতন দাস এবং কাজল বাগদির বক্তব্য, ‘‘রাজনগর এলাকায় দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। ফলে দিনের বহু সময়ই বিদ্যুৎ সংযোগ চলে যায়। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমাদের এলাকায় আর বার বার কারেন্ট যাবে না।’’

যদিও প্রকল্প থেকে সরাসরি রাজনগর বা আশপাশের কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ দেওয়া হবে না, গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার ফলে সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়বে বলেই আশা স্থানীয়দের।

হারিয়ে যাওয়ার পথে কোঙা গাছ?

তবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যেই উঠে এসেছে পরিবেশ এবং উদ্ভিদ সংরক্ষণের আর একটি প্রশ্ন। যে জমিতে এক সময়ে সিসাল গাছের চাষ হত, সেই জমির একটি বড় অংশ এখন সৌর প্যানেলে ঢেকে যাচ্ছে। ফলে সিসাল বা কোঙা গাছের অস্তিত্বও ধীরে ধীরে কমছে বলে দাবি উদ্ভিদবিদদের একাংশের।

উদ্ভিদবিদদের মতে, বহু বছর আগে মেক্সিকো থেকে কাঁটাযুক্ত এই উদ্ভিদ ভারতে আনা হয়েছিল। পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এর চাষ শুরু হয়। সিসাল গাছের পাতার আঁশ থেকে শক্ত দড়ি তৈরি করা যায়। শিল্পক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।

কিন্তু বাণিজ্যিক চাহিদা কমে যাওয়ার পরে গাছটির চাষও অনেক জায়গায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাজনগরের পুরনো ফার্মও সেই পরিবর্তনের সাক্ষী।

উদ্ভিদবিদদের বক্তব্য, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তার পাশাপাশি স্থানীয় ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভেষজগুণসম্পন্ন উদ্ভিদগুলির সংরক্ষণও জরুরি। পরিকল্পিত ভাবে সংরক্ষণ না করা হলে ভবিষ্যতে বীরভূমের মাটি থেকে কোঙা গাছের অস্তিত্ব প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

ফলে রাজনগরের পুরনো সিসাল ফার্ম এখন এক অদ্ভুত পরিবর্তনের সাক্ষী। যে জমিতে এক সময়ে প্রাকৃতিক আঁশ থেকে দড়ি তৈরি হত, সেখানেই এ বার সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হবে। পুরনো শিল্পের স্মৃতি মুছে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে নতুন প্রযুক্তি। এক দিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর আশা, অন্য দিকে হারিয়ে যেতে বসা একটি উদ্ভিদের সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন—দুই বিপরীত ছবিই এখন রাজনগরের এই জমিকে ঘিরে।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved