
নিউজ ডেস্ক; বন্দে ভারত থেকে বুলেট ট্রেন—ভারতের রেল ব্যবস্থায় গতি বাড়ানোর পর্ব ক্রমশই নতুন দিকে এগোচ্ছে। সেই আবহেই এ বার ভারতের হাই স্পিড রেল পরিষেবার জন্য নতুন প্রস্তাব নিয়ে এল রাশিয়া। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৬০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম ‘Ivolga FG’ হাই স্পিড ট্রেনকে ভারতের জন্য সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে রাশিয়ার রোলিং স্টক নির্মাতা সংস্থা Transmashholding বা TMH।
তবে এই প্রস্তাবের বিশেষত্ব শুধু দ্রুতগতির ট্রেনেই নয়। বিদেশ থেকে তৈরি ট্রেন এনে ভারতে চালানোর পরিবর্তে ভারতেই এই ট্রেন উৎপাদন করার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি রয়েছে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ ভাবে হাই স্পিড রেল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা। অর্থাৎ, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় রেল শিল্পে স্থানীয় উৎপাদনের পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি দিল্লিতে আয়োজিত INNOPROM.India অনুষ্ঠানে TMH-এর তরফে ‘Ivolga FG’ নিয়ে একটি প্রেজ়েন্টেশন দেওয়া হয়। সেখানেই ভারতের বাজারের জন্য এই হাই স্পিড ট্রেনের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থার পরিকল্পনায় ভারতের মাটিতে উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
TMH-এর প্রস্তাবিত ‘Ivolga FG’ মূলত উচ্চগতির রেল পরিষেবার জন্য তৈরি একটি ট্রেন কনসেপ্ট। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণ কনফিগারেশনে ট্রেনটিতে আটটি কামরা থাকার কথা। একসঙ্গে ৬০০-রও বেশি যাত্রী পরিবহণের সক্ষমতাও রয়েছে বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে।
শুধু গতি নয়, দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেনটি পরিষেবায় রাখার বিষয়টিও সামনে এনেছে রাশিয়ার সংস্থা। TMH-এর তথ্য অনুযায়ী, বড় ধরনের সমস্যা ছাড়াই প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত এই ট্রেন চালানো সম্ভব হতে পারে। তবে বাস্তবে ভারতীয় পরিবেশ, রেল পরিকাঠামো এবং পরিষেবার প্রয়োজনের সঙ্গে এই ট্রেন কতটা মানিয়ে নিতে পারে, তা নির্ধারণের জন্য একাধিক পরীক্ষা প্রয়োজন হবে।
ভারতের মতো বিশাল দেশে হাই স্পিড রেলের ক্ষেত্রে শুধু সর্বোচ্চ গতি যথেষ্ট নয়। যাত্রী ধারণক্ষমতা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য, রেলপথের পরিকাঠামো এবং উৎপাদন খরচ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হয়। সেই জায়গায় ‘Ivolga FG’-এর প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ের প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের পরেই স্পষ্ট হবে।
রাশিয়ার প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং’। TMH-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতে এই ট্রেন উৎপাদন করা হলে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হতে পারে। অর্থাৎ, ট্রেনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং প্রযুক্তিগত উপাদানের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্থা ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
এতে এক দিকে যেমন ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ধরনের দেশীয় উৎপাদন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে, তেমনই অন্য দিকে হাই স্পিড রেল প্রযুক্তিতে ভারতীয় কর্মী ও সংস্থাগুলির দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টিও এই প্রস্তাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি প্রযুক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে ভারতেই উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরির দিকে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে TMH-এর প্রস্তাব থেকে ইঙ্গিত মিলেছে।
ভারতের রেল ক্ষেত্রে TMH-এর একেবারে নতুন করে প্রবেশ নয়। এর আগেও ভারতীয় রেল ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করেছে রাশিয়ার এই সংস্থা। ভারতীয় রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড বা RVNL-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি Kinet Railway Solutions-এর মাধ্যমে TMH ইতিমধ্যেই ভারতের রেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
এই যৌথ উদ্যোগ বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন তৈরি এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের কাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভারতীয় রেল ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত এবং উৎপাদন কাঠামো সম্পর্কে TMH-এর একটি পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে এ বার আরও উচ্চগতির রেল প্রকল্পের দিকে নজর দিতে চাইছে রাশিয়ার সংস্থাটি।
ভারতে বর্তমানে হাই স্পিড রেলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আলোচিত প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প। জাপানের প্রযুক্তি ও সহযোগিতায় সেই প্রকল্প এগোচ্ছে। এরই মধ্যে রাশিয়ার ‘Ivolga FG’ প্রস্তাব সামনে আসায় ভারতের হাই স্পিড রেল ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত বিকল্প নিয়ে আলোচনার পরিধি আরও বাড়ল।
তবে এখনই ‘Ivolga FG’ ভারতে চালু হচ্ছে বা ট্রেনটির বরাত চূড়ান্ত হয়েছে—এমন কোনও সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। আপাতত এটি রাশিয়ার তরফে দেওয়া একটি প্রস্তাব। সেটি বাস্তবায়নের আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদন ব্যয়, ভারতীয় রেলপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং বাণিজ্যিক কার্যকারিতা—একাধিক বিষয় যাচাই করতে হবে।
হাই স্পিড ট্রেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত পরীক্ষাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ভারতের রেলপথে ৩৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতির ট্রেন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, ট্র্যাক, সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রযুক্তির সঙ্গে ‘Ivolga FG’ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষেবা খরচও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি হাই স্পিড ট্রেন শুধু কেনা বা তৈরি করলেই হয় না, বছরের পর বছর সেটিকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ভাবে চালানোর ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
ফলে দিল্লির INNOPROM.India-তে TMH-এর প্রেজ়েন্টেশনকে ভারতের হাই স্পিড রেল ক্ষেত্রে একটি নতুন প্রস্তাব হিসেবে দেখা হলেও এর পরবর্তী পথ এখনও পরীক্ষার উপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তিগত এবং বাণিজ্যিক পরীক্ষায় সফল হলে তবেই ‘Ivolga FG’-এর ভারতীয় যাত্রার সম্ভাবনা বাস্তব রূপ পেতে পারে।
এক নজরে
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments