
নিউজ ডেস্ক; রাত নামলেই রাস্তায় শুরু হচ্ছে বিকট শব্দে বাইকের দাপাদাপি। কখনও আচমকা গর্জনের মতো শব্দ, কখনও আবার বেপরোয়া গতিতে ছুটে যাচ্ছে একের পর এক মোটরবাইক। উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের বিভিন্ন এলাকায় রাতের এই বাইক-দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। বিশেষ করে পরিবর্তিত সাইলেন্সারের কারণে তৈরি হওয়া তীব্র শব্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এ বার রাতে বিশেষ অভিযানে নামল অশোকনগর ট্র্যাফিক পুলিশ।
রবিবার রাতে অশোকনগরের চৌরঙ্গী মোড়ে অভিযান চালানো হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযানে প্রায় সাতটি বাইক আটক করা হয়েছে। ওই বাইকগুলির বিরুদ্ধে বিকট শব্দ করে চলাচল, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং বিভিন্ন ট্র্যাফিক আইন অমান্য করার অভিযোগ ছিল। আটক মোটরবাইকগুলির পরিবর্তিত সাইলেন্সার খুলে নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আরোহীদের জরিমানাও করা হয়েছে।
পুলিশের এই অভিযানে শুধু শব্দদূষণ বা সাইলেন্সারই নজরে ছিল না। হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা এবং নম্বর প্লেট না থাকার মতো একাধিক ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগেও বেশ কয়েক জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে খবর। পাশাপাশি রাতের রাস্তায় কেউ মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছেন কি না, সে দিকেও নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে ট্র্যাফিক পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অশোকনগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এবং মোড়ে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিছু বাইক এমন বিকট শব্দ করে ছুটে যায় যে বাড়ির ভিতর থেকেও তা স্পষ্ট ভাবে শোনা যায়। আচমকা সেই শব্দে বিশেষ সমস্যায় পড়েন শিশু এবং বয়স্করা। অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই ধরনের শব্দের কারণে অস্বস্তি বাড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শুধু একটি রাতের সমস্যা নয়, গত কয়েক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশকে অভিযোগ জানাচ্ছিলেন এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, পরিবর্তিত সাইলেন্সার লাগিয়ে বাইক চালানোর প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। নিয়মিত এমন শব্দে রাতের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শব্দদূষণও বাড়ছে। সেই অভিযোগ সামনে আসার পরই রবিবার রাতে বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ।
বাইক থেকে সাইলেন্সার খুলে নেওয়ার ঘটনাটিও অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণ ভাবে মোটরবাইকের সাইলেন্সারের কাজ হল ইঞ্জিন থেকে বেরোনো গ্যাসের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা। সাইলেন্সারের ভিতরে থাকা একাধিক চেম্বার, বাফল এবং অন্যান্য অংশ শব্দের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু বাইকের শব্দ আরও জোরালো করার উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত সাইলেন্সার ব্যবহার করা হলে সেই শব্দ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা বদলে যায় বা সরিয়ে ফেলা হয়। ফলেই তৈরি হয় অত্যন্ত তীব্র এবং কর্কশ শব্দ।
এই ধরনের পরিবর্তিত সাইলেন্সার ব্যবহার করে বাইক চালানোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনের তরফে অভিযান চালানো হয়। অশোকনগরেও এ বার সেই পদক্ষেপই করা হল। পুলিশ জানিয়েছে, শুধু সাইলেন্সার খুলে নেওয়া নয়, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জরিমানাও করা হয়েছে।
রবিবার রাতের অভিযানে বেপরোয়া গতির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। রাতের ফাঁকা রাস্তায় দ্রুতগতিতে বাইক চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াতে পারে। তার সঙ্গে যদি হেলমেট না থাকে, বৈধ লাইসেন্স না থাকে বা বাইকের নম্বর প্লেট না থাকে, তা হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলে ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গের প্রতিটি দিকই নজরে রাখা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
অশোকনগরের বাসিন্দাদের একাংশ পুলিশের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাতে শান্ত পরিবেশের মধ্যে আচমকা বিকট শব্দে বাইক ছুটে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা হচ্ছিল। বিশেষ করে আবাসিক এলাকাগুলিতে এমন শব্দ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। পুলিশের অভিযানে অন্তত কিছুটা হলেও এই প্রবণতায় লাগাম পড়বে বলে আশা তাঁদের।
তবে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র এক দিনের অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাতের দিকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং রাস্তাগুলিতে নিয়মিত নজরদারি চালানো প্রয়োজন। বিশেষ করে যে সমস্ত এলাকায় বাইক নিয়ে বেপরোয়া গতিতে চালানোর অভিযোগ বেশি, সেখানে ধারাবাহিক ভাবে পুলিশি তৎপরতা থাকা দরকার।
ট্র্যাফিক পুলিশ সূত্রে অবশ্য জানানো হয়েছে, অশোকনগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং রাস্তায় আগামী দিনেও এই ধরনের অভিযান চলবে। পরিবর্তিত সাইলেন্সার ব্যবহার, বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং অন্যান্য ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং নম্বর প্লেট সংক্রান্ত নিয়মও পরীক্ষা করা হবে।
প্রশাসনের এই উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, নজরদারি কতটা ধারাবাহিক হয়, এখন সেটাই দেখার। কারণ রাতের রাস্তায় বাইকের বিকট শব্দের বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, নিয়মিত সচেতনতা এবং নজরদারি—দুইয়েরই প্রয়োজন রয়েছে। অশোকনগরে রবিবার রাতের অভিযান সেই বৃহত্তর পদক্ষেপেরই শুরু কি না, তা সময়ই বলবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments