
নিউজ ডেস্ক; রাতের অন্ধকারে আচমকা বিকট শব্দ। ঘুম ভেঙে যায় মুদির দোকানি এবং তাঁর পরিবারের। প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেননি তাঁরা। পরে জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! দোকানের দেওয়াল ভেঙে শুঁড় ঢুকিয়ে একের পর এক বস্তা টেনে বার করছে একটি বুনো হাতি। মুড়ি থেকে শুরু করে বেসন, ময়দা—দোকানে থাকা খাবারের প্রায় সব কিছুই শুঁড়ে তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলল সে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে চলল হাতিটির তাণ্ডব। সব কিছু চোখের সামনে দেখেও আতঙ্কে ঘরের বাইরে বেরোতে পারেননি পরিবারের সদস্যেরা।
শনিবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে খড়্গপুর বন বিভাগের কলাইকুণ্ডা রেঞ্জের সাঁকরাইল বিটের অন্তর্গত জোড়াশাল গ্রামে। স্থানীয় সূত্রে খবর, পেঁচাবিন্দার জঙ্গল থেকে একটি দলছুট বুনো হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। পূর্ণাপানি গ্রামের দিক থেকে হাতিটি জোড়াশালের দিকে আসে। পথে একটি বাড়ির ক্ষতি করার পর সেটি গ্রামে ঢোকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
হাতির গতিবিধি টের পাওয়ার পর থেকেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, খাবারের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে হাতিটি প্রথমে গ্রামের কয়েকটি বাড়ির কাছে যায়। তিনটি বাড়ির দরজা ও জানলা শুঁড় দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে সেটি। একটি মাটির বাড়ির দেওয়ালের একাংশও ভেঙে দেয় হাতিটি। এরপর গ্রামের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার নজরে পড়ে পরিতোষ দাসের মুদির দোকান।
তার পরেই ঘটে মূল ঘটনা। দোকানের সামনের দেওয়ালে ধাক্কা মেরে সেটির একটি অংশ ভেঙে ফেলে হাতিটি। দেওয়াল ভাঙার প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে যায় দোকানি পরিতোষ এবং তাঁর পরিবারের। বাইরে বেরিয়ে পরিস্থিতি দেখার সাহস হয়নি তাঁদের। ঘরের ভিতর থেকেই জানলা দিয়ে তাঁরা হাতিটির তাণ্ডব দেখতে থাকেন।
পরিতোষের বক্তব্য অনুযায়ী, দেওয়াল ভাঙার পর হাতিটি দোকানের ভিতরে শুঁড় ঢুকিয়ে একের পর এক মালপত্রের বস্তা টেনে বার করতে শুরু করে। মুড়ি, বেসন, ময়দা-সহ দোকানে মজুত থাকা বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী খেতে থাকে সে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই বেশ কিছুক্ষণ ধরে খাবার খুঁজে খায় হাতিটি।
প্রায় ৩০ মিনিট ধরে চলে এই তাণ্ডব। হাতিটিকে তাড়ানোর জন্য শেষ পর্যন্ত গ্রামের কয়েক জন পটকা ফাটাতে শুরু করেন। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে বলে দাবি স্থানীয়দের। পটকার শব্দ শুনে হাতিটি গ্রামবাসীদের দিকে তেড়ে যায়। ফলে আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন তাঁরা।
এর পর কিছুক্ষণ দোকানের সামনে ঘোরাঘুরি করে হাতিটি সেখান থেকে সরে যায়। ফের জঙ্গলের দিকে চলে যায় সেটি। স্থানীয়দের অনুমান, পেঁচাবিন্দার জঙ্গলের দিকেই ফিরে যায় বুনো হাতিটি। তবে তার আগেই দোকান এবং কয়েকটি বাড়ির ক্ষতি হয়ে যায়।
দোকানি পরিতোষ জানিয়েছেন, হাতির হানায় তাঁর মুদির দোকানের সামনের অংশ ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি দোকানে থাকা বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রীও নষ্ট হয়েছে বা হাতির পেটে গিয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় লক্ষাধিক টাকা বলে দাবি তাঁর। আচমকা এমন ঘটনায় কী ভাবে ব্যবসা ফের শুরু করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
রাতের ঘটনার পর রবিবার সকালে জোড়াশাল গ্রামে পৌঁছন বন দফতরের কর্মীরা। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি এবং দোকান পরিদর্শন করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে ক্ষতিপূরণের আবেদনপত্র তুলে দেওয়া হয়। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব খতিয়ে দেখে নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে বলে বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে।
খড়্গপুর বন বিভাগের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, একটি দলছুট বুনো হাতি গ্রামে ঢুকে একটি দোকান এবং কয়েকটি ঘরের ক্ষতি করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ফর্ম দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাতিটির গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছে, যাতে ফের সেটি লোকালয়ে ঢুকে কোনও বিপত্তি না ঘটাতে পারে।
তবে এই ঘটনার পর ফের সামনে এসেছে হাতি তাড়ানো বা ‘এলিফ্যান্ট ড্রাইভ’ নিয়ে বন দফতরের সমস্যার কথা। সাধারণত লোকালয়ে হাতির দল ঢুকে পড়লে তাদের জঙ্গলের দিকে ফেরানোর কাজে হুলা পার্টির সদস্যদের ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় স্তরে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে তাঁদের কাজে নিয়োগ করা হয় বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে হুলা পার্টির সদস্যদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। সেই কারণে তাঁরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। এর ফলে হাতি লোকালয়ে ঢুকলে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে বন দফতরকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাতির সংখ্যা বা তাদের গতিবিধি বাড়লে এই সমস্যা আরও জটিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা স্থানীয়দের।
জোড়াশালের ঘটনার পাশাপাশি অন্য একটি হাতির গতিবিধি ঘিরেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে নয়াগ্রামে। সেখানেও একটি বুনো হাতি রামেশ্বর হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বেশ কয়েকটি গ্রামের রাস্তা ধরে হাতিটিকে হাঁটতে দেখা যায়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ হাতিটিকে দেখতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার হাতিটির পিছু নিতেও শুরু করেন।
পরে অবশ্য হাতিটি তপোবনের জঙ্গলের দিকে চলে যায়। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, নয়াগ্রামের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোনও বাড়ি বা সম্পত্তির ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে লোকালয়ে হাতি ঢোকার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এক দিকে খাবারের সন্ধানে জঙ্গল ছেড়ে হাতির লোকালয়ে ঢুকে পড়া, অন্য দিকে তাদের নিরাপদে জঙ্গলে ফেরানোর ব্যবস্থায় ঘাটতির অভিযোগ—দুই ঘটনাই ফের জঙ্গল লাগোয়া গ্রামগুলির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় আচমকা হাতি ঢুকে পড়লে সাধারণ মানুষের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। জোড়াশালের ঘটনায় দোকানি ও তাঁর পরিবারের সদস্যেরা ঘরের ভিতর থেকে গোটা ঘটনা দেখলেও বাইরে বেরোনোর ঝুঁকি নেননি। তাঁদের সেই সিদ্ধান্তই হয়তো বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করেছে।
এখন নজর সেই দলছুট হাতিটির গতিবিধির দিকে। বন দফতর নজরদারি চালালেও জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাতির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় হুলা পার্টির ভূমিকা ফের সক্রিয় করা যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়া হাতির সংখ্যা বা ঘটনা বাড়লে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments