Homeমুর্শিদাবাদবহরমপুররাধারঘাট-১মুর্শিদাবাদ থেকে জাপানে পাড়ি দুর্গার, শিল্পী মৃন্ময়ের হাতে তৈরি ফাইবারের প্রতিমার অপেক্ষা কার্গো বিমানের

মুর্শিদাবাদ থেকে জাপানে পাড়ি দুর্গার, শিল্পী মৃন্ময়ের হাতে তৈরি ফাইবারের প্রতিমার অপেক্ষা কার্গো বিমানের

নিউজ ডেস্ক; মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে তৈরি দেবী দুর্গা এ বার পাড়ি দিতে চলেছেন সুদূর জাপানে। বহরমপুরের ভাগীরথীর পশ্চিম পাড় লাগোয়া রাধারঘাট-১ পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা শিল্পী মৃন্ময় দাসের হাতে তৈরি ফাইবারের
resizeplus_Screenshot 2026-09-14 133720_edited

নিউজ ডেস্ক; মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে তৈরি দেবী দুর্গা এ বার পাড়ি দিতে চলেছেন সুদূর জাপানে। বহরমপুরের ভাগীরথীর পশ্চিম পাড় লাগোয়া রাধারঘাট-১ পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা শিল্পী মৃন্ময় দাসের হাতে তৈরি ফাইবারের দুর্গাপ্রতিমা যাচ্ছে জাপানের ওসাকায়। প্রতিমাটির উচ্চতা প্রায় আড়াই ফুট, চওড়া দু’ফুট। ইতিমধ্যেই প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ। এখন শুধু জাপানগামী কার্গো বিমানে ওঠার অপেক্ষা।

এই প্রতিমার পিছনে রয়েছে এক তরুণ শিল্পীর দীর্ঘদিনের সাধনা এবং নিজের শখকে পেশায় পরিণত করার গল্প। মৃন্ময়ের পরিবারের কেউ প্রথাগত ভাবে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত নন। এমনকি প্রতিমা শিল্প তৈরির জন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণও নেননি তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মৃন্ময়ের শিল্পী হয়ে ওঠার শুরুটা হয়েছিল ছোটবেলার আঁকার প্রতি ভালবাসা থেকেই।

মৃন্ময় জানান, ছোট থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে মাটির মূর্তি তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রথম দিকে শুধুই শখের বশে প্রতিমা গড়তেন। সময়ের সঙ্গে সেই শখই হয়ে ওঠে তাঁর জীবিকার অন্যতম প্রধান পথ। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে পেশাদার ভাবে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি।

শিল্পীর কথায়, ‘‘ছেলেবেলা থেকেই আঁকায় ঝোঁক ছিল। আঁকা শিখতাম। সেখান থেকেই মাটির প্রতিমা গড়ার ভাবনা মাথায় এসেছিল। প্রথমে শখে প্রতিমা গড়তাম। এখন পেশাদার হয়ে উঠেছি।’’

মৃন্ময়ের শিল্পকর্মের পরিচিতি শুধু মুর্শিদাবাদ বা বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নিজের তৈরি প্রতিমার ছবি নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন তিনি। সেই ছবি দেখেই বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁর কাছে প্রতিমা তৈরির বায়না আসে। গত দু’বছরেই তাঁর তৈরি একাধিক প্রতিমা পাড়ি দিয়েছে বিদেশে।

শিল্পী জানিয়েছেন, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে তাঁর হাতে তৈরি লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং নারায়ণ প্রতিমা আমেরিকায় গিয়েছিল। প্রতিটি প্রতিমার উচ্চতা ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৮ ইঞ্চি। কলকাতার বাসিন্দা মিন্টু বৈষ্ণব বর্তমানে আমেরিকায় থাকেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় মৃন্ময়ের কাজ দেখে তাঁর তৈরি প্রতিমা নিয়ে আগ্রহী হন মিন্টু। সেই সূত্রেই মৃন্ময়ের তৈরি প্রতিমা বিদেশে পৌঁছয়।

এ বার সেই পরিচিতির হাত ধরেই এসেছে আরও বড় সুযোগ। মিন্টুর মাধ্যমে জাপানপ্রবাসী সর্বাণী মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ হয় মৃন্ময়ের। জাপানে দুর্গাপুজোর জন্য একটি প্রতিমা প্রয়োজন ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় শিল্পীর কাজ দেখে তাঁর হাতেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরির দায়িত্ব দেন সর্বাণী। সেই বায়না গ্রহণ করেই কয়েক মাস আগে কাজে হাত দেন মৃন্ময়।

চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ দুর্গাপ্রতিমাটি তৈরির বরাত পেয়েছিলেন তিনি। এরপর প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস ধরে চলে প্রতিমা নির্মাণের কাজ। ছোট আকারের হলেও বিদেশে পাঠানোর কথা মাথায় রেখে প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ পরিকল্পনা করতে হয়েছে শিল্পীকে।

প্রতিমাটি তৈরি হয়েছে ফাইবার দিয়ে। তবে সরাসরি ফাইবার দিয়ে কাজ শুরু করেননি শিল্পী। প্রথমে মাটি দিয়ে তৈরি করা হয় মূল মডেল। সেই মডেলের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় প্লাস্টারের ছাঁচ। পরে ওই ছাঁচের মধ্যে ফাইবার ব্যবহার করে চূড়ান্ত প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। ফলে প্রতিমাটি যেমন তুলনামূলক ভাবে হালকা, তেমনই দূরপাল্লার পরিবহণের জন্যও সুবিধাজনক।

বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্যাকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কারণেই দুর্গাপ্রতিমার গঠনেও কিছুটা পরিবর্তন রাখা হয়েছে। দেবী দুর্গা, অসুর এবং সিংহকে একচালার কাঠামোয় রাখা হলেও লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ এবং কার্তিককে পৃথক ভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতিমার বিভিন্ন অংশ আলাদা করে নিরাপদে প্যাক করা সম্ভব হবে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যাতে কোনও অংশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ নজর দিয়েছেন শিল্পী।

ফাইবারের প্রতিমা হলেও সাজসজ্জায় কোনও কৃত্রিমতার ছাপ রাখতে চাননি মৃন্ময়। তাঁর তৈরি প্রতিমায় ব্যবহার করা হয়েছে হাতে তৈরি অলঙ্কার। শিল্পীর দাবি, ফাইবারের কাঠামোর সঙ্গে হাতের কাজের অলঙ্কারের সমন্বয়ে প্রতিমাটিকে যতটা সম্ভব ঐতিহ্যবাহী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

মৃন্ময়ের আশা, বাংলার মাটিতে তৈরি তাঁর দুর্গাপ্রতিমা জাপানের ওসাকাতেও সমান ভাবে মানুষের মন জয় করবে। তাঁর কথায়, ‘‘ফাইবারের তৈরি প্রতিমা হলেও প্রতিটি মূর্তিতে হাতে তৈরি অলঙ্কার ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করি এই প্রতিমা জাপানে বিশেষ সমাদর পাবে।’’

একসময় শুধুমাত্র নিজের আনন্দের জন্য মূর্তি গড়তেন মৃন্ময়। সেই শখই আজ তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করে তুলছে। আমেরিকার পর এ বার তাঁর তৈরি দুর্গা পাড়ি দিচ্ছেন জাপানে। বাংলার এক অপ্রথাগত প্রতিমাশিল্পীর হাতের কাজ যে ভাবে ধীরে ধীরে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশে পৌঁছে যাচ্ছে, তাতে মৃন্ময়ের এই যাত্রা শুধু একটি প্রতিমার বিদেশযাত্রা নয়—নিজের প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের জোরে এক শিল্পীর স্বপ্নপূরণের গল্পও বটে

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved