Homeনদিয়াকৃষ্ণগঞ্জকৃষ্ণগঞ্জে গেরুয়া ঝড় অব্যাহত! বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিল বিজেপি, ব্লকের সবকটিই এখন পদ্ম-শিবিরে

কৃষ্ণগঞ্জে গেরুয়া ঝড় অব্যাহত! বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিল বিজেপি, ব্লকের সবকটিই এখন পদ্ম-শিবিরে

বিশ্ব ব্যানার্জী:রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পঞ্চায়েত স্তরের ক্ষমতার হাতবদল এক অতি পরিচিত দৃশ্য হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতে রীতিমতো ফাটল ধরতে শুরু করেছে। এবার নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ
resizeplus_ranaghat

বিশ্ব ব্যানার্জী:রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পঞ্চায়েত স্তরের ক্ষমতার হাতবদল এক অতি পরিচিত দৃশ্য হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতে রীতিমতো ফাটল ধরতে শুরু করেছে। এবার নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতে কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতার রাশ নিজেদের হাতে তুলে নিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই জয়ের মাধ্যমে শুধু একটি পঞ্চায়েতই নয়, বরং গোটা কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের রাজনৈতিক মানচিত্রের রং সম্পূর্ণ বদলে গেল। জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের মোট সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েতের সবকটিতেই নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করতে সক্ষম হল গেরুয়া শিবির। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের এই অনায়াস পতন এবং বিরোধীদের এই নিরঙ্কুশ উত্থান আগামী দিনের জেলা রাজনীতির ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।

জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনৈতিক সমীকরণ প্রথম থেকেই যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক ছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এই গ্রাম পঞ্চায়েতের মোট আসন সংখ্যা ২১। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গিয়েছিল, কোনও দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সেবার ২১টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস জয়লাভ করেছিল ১০টি আসনে। অন্যদিকে, মূল বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি পেয়েছিল ৮টি আসন এবং বামনফ্রন্ট বা সিপিআইএমের ঝুলিতে গিয়েছিল ৩টি আসন। স্বাভাবিকভাবেই ত্রিশঙ্কু এই পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন নিয়ে শুরু থেকেই জটিলতা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং দলীয় কৌশলের ওপর ভর করে তৃণমূল কংগ্রেস বোর্ড গঠন করতে সক্ষম হয়। তৃণমূলের পক্ষ থেকে জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন মনিকা বিশ্বাস এবং উপপ্রধানের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সুজাতা ঘোষ। প্রথমদিকে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও, রাজ্য স্তরে বিধানসভা নির্বাচনের পর ক্ষমতার পালাবদল ঘটতেই স্থানীয় স্তরের রাজনীতিতেও ব্যাপক রদবদল লক্ষ্য করা যায়।

বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক পরেই জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনৈতিক আবহাওয়া আচমকা উত্তপ্ত হতে শুরু করে। স্থানীয় সূত্রে খবর, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরেই তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত পঞ্চায়েত বোর্ডের অন্দরে ব্যাপক ডামাডোল শুরু হয়। হঠাৎ করেই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পঞ্চায়েত প্রধান মনিকা বিশ্বাস এবং উপপ্রধান সুজাতা ঘোষ সহ শাসকদলের অন্যান্য সদস্যরা একে একে নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দিতে শুরু করেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, শারীরিক অসুস্থতা নিছকই একটি অজুহাত মাত্র; আদতে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রবল চাপ এবং দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণেই এই গণপদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। শাসকদলের এই আকস্মিক ভাঙনের ফলেই পঞ্চায়েতটি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এবং নতুন করে বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

নতুন করে বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রেও সমীকরণে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছিল। ২১ আসনের এই পঞ্চায়েতে বিজেপির এক সদস্যের অকাল প্রয়াণ ঘটে এবং অপর এক বিজেপি সদস্য ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আগেই নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের বর্তমান কার্যকর আসন সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১৯-এ। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন বোর্ড গঠনের জন্য তলবি সভা ডাকা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, তলবি সভার দিন বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস বা সিপিআইএমের কোনও সদস্যই উপস্থিত ছিলেন না। সম্পূর্ণ ফাঁকা ময়দানে শুধুমাত্র বিজেপির সাতজন নির্বাচিত সদস্য সেদিন পঞ্চায়েত কার্যালয়ে উপস্থিত হন। শাসকদল ও অন্যান্য বিরোধীদের অনুপস্থিতির কারণে কোনও ভোটাভুটি বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজনই পড়েনি। উপস্থিত সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে বিজেপির মিনতি রানী বিশ্বাসকে জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েতের নতুন প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। পাশাপাশি, উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বিপ্লব হালদার।

এই জয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লক বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। জয়ঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েত হাতছাড়া হওয়ার ফলে এই ব্লকে তৃণমূল কংগ্রেসের আর কোনও অস্তিত্বই রইল না। ব্লকের মোট সাতটি পঞ্চায়েতের সবকটিতেই এখন উড়ছে বিজেপির দলীয় পতাকা, যা তৃণমূলের জেলা নেতৃত্বের কাছে এক বিরাট অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে বিনা যুদ্ধে শাসকদল একটি গোটা ব্লক হাতছাড়া করল, তা নিয়ে দলের অন্দরেই ইতিমধ্যেই কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বোর্ড দখল করার পর রীতিমতো উচ্ছ্বসিত বিজেপি শিবির। নতুন পঞ্চায়েত প্রধান মিনতি রানী বিশ্বাস দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক রং না দেখে সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাজ করাই হবে আমাদের নতুন বোর্ডের মূল লক্ষ্য। বিগত দিনে এই এলাকার মানুষ নানা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা দুর্নীতিমুক্ত এবং স্বচ্ছ একটি পঞ্চায়েত ব্যবস্থা উপহার দিতে চাই। রাস্তাঘাট, পানীয় জল এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে আমরা অগ্রাধিকার দেব।” স্থানীয় বাসিন্দারাও নতুন বোর্ডের কাছে অনেক আশা রাখছেন। রাজনৈতিক পালাবদল যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষ চাইছেন এলাকার সার্বিক উন্নয়ন এবং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের উন্নতি। এখন দেখার বিষয়, প্রতিশ্রুতি পূরণে বিজেপির এই নতুন বোর্ড আগামী দিনে কতটা সফল হয় এবং কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকে নিজেদের এই আধিপত্য তারা কতদিন বজায় রাখতে পারে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved