
নিউজ ডেস্ক; ফ্রি, ফ্রি, ফ্রি! বিজ্ঞাপনের কোনও চমক নয়, আবার কোনও পণ্যের প্রচারও নয়। দুর্গাপুজোর আগে রাজ্যের প্রায় হাজার জন প্রবীণ নাগরিকের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। একেবারে বিনা খরচে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গুজরাটের ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দির দর্শনে। রাজ্যের তথ্য-সংস্কৃতি ও পর্যটন দফতরের সৌজন্যে আয়োজিত এই বিশেষ তীর্থযাত্রার জন্য ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে।
নবান্ন সূত্রে খবর, শুক্রবার রাত পোহালেই শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর কলকাতা স্টেশন থেকে বিশেষ ট্রেনে যাত্রা শুরু করবেন নির্বাচিত প্রবীণ নাগরিকেরা। দীর্ঘ প্রায় ৪৮ ঘণ্টার ট্রেনযাত্রার পর তাঁরা পৌঁছবেন গুজরাটের ভেরাভাল জংশনে। সেখান থেকে গুজরাট সরকারের বিশেষ বাসে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবে সোমনাথ মন্দিরে। অর্থাৎ ট্রেন থেকে নামার পরেও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকবে সরকারি তরফেই।
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগে মূল লক্ষ্য প্রবীণ নাগরিকদের তীর্থদর্শনের সুযোগ করে দেওয়া। দূরত্বের কারণে যাঁদের পক্ষে নিজের উদ্যোগে সোমনাথ যাওয়া কঠিন, তাঁদের জন্যই এই সরকারি আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কলকাতা থেকে গুজরাটের সোমনাথের দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। ফলে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এই তীর্থযাত্রার জন্য নামের তালিকা তৈরির কাজ হয়েছে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায়। জেলাশাসকদের দফতর এবং কলকাতা পুরসভার কমিশনারের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই যাত্রীদের তালিকা তৈরি করা হয়। যাত্রীরা কলকাতা স্টেশনে কী ভাবে পৌঁছবেন, তাঁদের সঙ্গে কী কী জিনিস থাকবে, তাঁদের কোনও অতিরিক্ত সঙ্গী প্রয়োজন কি না—এমন একাধিক তথ্য প্রশাসনের কাছে জমা নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের তরফে যাত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। জানা গিয়েছে, এমন প্রবীণ নাগরিকদেরই এই সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, যাঁদের চলাফেরার ক্ষেত্রে কোনও বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ যাত্রাপথে নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলি সামলাতে সক্ষম ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে কোনও যাত্রী চাইলে নিজের সঙ্গে অতিরিক্ত একজন সঙ্গী নিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু সেই অতিরিক্ত সঙ্গীর যাবতীয় খরচ সংশ্লিষ্ট যাত্রীকেই বহন করতে হবে। সরকারি ব্যবস্থার আওতায় থাকা সুবিধাগুলি মূলত নির্বাচিত তীর্থযাত্রীদের জন্যই প্রযোজ্য।
সোমনাথে পৌঁছনোর পর থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকছে এই সফরের অংশ হিসেবে। পাশাপাশি মন্দির দর্শন এবং স্থানীয় যাতায়াতের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, সোমনাথে থাকা-খাওয়া এবং সেখানকার যাতায়াতের খরচ বহন করবে গুজরাট সরকার এবং কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক। ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাত্রা করা প্রবীণদের জন্য গোটা সফরটি অনেকটাই নিশ্চিন্তে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে ট্রেনে ভেরাভাল জংশন স্টেশনে পৌঁছবেন তীর্থযাত্রীরা। সেখান থেকে বিশেষ বাসে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবে সোমনাথ মন্দিরে। দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার কারণে যাত্রীদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখার বিষয়েও প্রশাসনের তরফে আগে থেকেই নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে।
আরব সাগরের তীরে সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে অবস্থিত সোমনাথ মন্দির ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা। ভেরাভালের কাছেই অবস্থিত এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কাহিনি এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মন্দিরটি একাধিক বার আক্রমণ, ধ্বংস এবং লুটের মুখে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আবারও নির্মিত হয়েছে সোমনাথ।
স্বাধীনতার পর বর্তমান সোমনাথ মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের। তাঁর উদ্যোগে মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ এগোয়। পরে স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ ১৯৫০ সালের ১১ মে মন্দিরটির উদ্বোধন করেন।
সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ ও উদ্বোধন ঘিরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু মনে করতেন, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকারকে সরাসরি কোনও ধর্মীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকা উচিত নয়। সেই কারণে তিনি মন্দিরের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি।
দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী সেই সোমনাথ মন্দিরেই এ বার পুজোর আগে পা রাখতে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রায় হাজার জন প্রবীণ নাগরিক। তাঁদের জন্য এই সফর নিছক বেড়ানো নয়, বরং বহু দিনের একটি ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগও হতে পারে।
দীর্ঘ যাত্রার আগে কলকাতা স্টেশনে তাঁদের নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতাও থাকবে। যাত্রীদের নির্দিষ্ট সময়ে স্টেশনে পৌঁছনো, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই, ট্রেনে ওঠার ব্যবস্থা—সবকিছুর দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির।
দুর্গাপুজোর আবহে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে ঘিরে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের সোমনাথ দর্শনে প্রবীণদের নিয়ে যাওয়ার এই বিশেষ কর্মসূচি কতটা সফল ভাবে সম্পন্ন হয়, এখন সেদিকেই নজর। সরকারি উদ্যোগে তীর্থযাত্রার এই সুযোগ পেয়ে বহু প্রবীণের কাছে সফরটি যে স্মরণীয় হয়ে উঠতে চলেছে, তা বলাই যায়।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments