
নিউজ ডেস্ক; সিকিমে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আতঙ্ক যেন কিছুতেই কাটছে না। উত্তর সিকিমের চাকুং নদীর পাড়ে পাহাড় ধসে তিস্তা নদীর একটি অংশে জলপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। তার মধ্যেই ফের পাহাড়ি রাজ্যে নতুন করে বিপর্যয়। এ বার ওয়েস্ট সিকিমের খেচিপেরি এলাকায় প্রবল কাদাধসের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হল গুরুত্বপূর্ণ রম্ভি–খেচিপেরি সড়ক। সোমবার রাতের ওই ঘটনায় রাস্তার একটি বড় অংশ কাদার স্রোতে ঢেকে যায়। কোথাও আবার রাস্তার অংশবিশেষ ধসে পড়েছে। ফলে ওই পথে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাতের দিকে পাহাড়ের উপর থেকে আচমকাই বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরের স্রোত নীচে নেমে আসে। সেই স্রোতেই রাস্তার বেশ কিছুটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই মেরামতির কাজ শুরু করেছে সিকিম রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর। ধস সরিয়ে রাস্তা যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে পাহাড়ি এলাকায় ফের বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
খেচিপেরি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় স্থানও। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা একটি লেককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। সিকিমে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের পাশাপাশি প্রতিদিন বহু মানুষ খেচিপেরি লেক ও সংলগ্ন ধর্মীয় স্থান দর্শনে যান। ফলে খেচিপেরির সঙ্গে যোগাযোগকারী রাস্তা আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পর্যটক—উভয় মহলেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় বর্ষাকাল এলেই ধস নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে সিকিমে একের পর এক বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কখনও পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ হয়েছে, কখনও নদীর জলস্তর বেড়ে বিপদ তৈরি হয়েছে, আবার কখনও নদীর গতিপথই সাময়িক ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এ বারের ঘটনাতেও সেই আশঙ্কাই নতুন করে সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে নর্থ সিকিমের ওসিবীর এলাকায় চাকুং নদীর পাড়ে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। সেই ধসের জেরে তিস্তা নদীর জলপ্রবাহের একটি অংশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা বিশেষ উদ্বেগের কারণ। কারণ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ কোনও ভাবে আটকে গেলে পিছনের দিকে জল জমতে শুরু করতে পারে। সময়ের সঙ্গে সেই জল একটি বড় জলাশয়ের আকার নিতে পারে। পরবর্তী সময়ে ধসের অংশ ভেঙে গেলে আচমকা জল নীচের দিকে নেমে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিস্তা নদীর উৎস নর্থ সিকিমের চোলামু লেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদ বরফগলা জলের অন্যতম উৎস। পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা জলধারা ক্রমশ তিস্তাকে সমৃদ্ধ করে। ফলে নদীর নীচের দিকে কোথাও বড়সড় বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু ওই নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। জল জমে তৈরি হওয়া অস্থায়ী হ্রদ পরে ভেঙে গেলে তার জলপ্রবাহ নীচের দিকে থাকা জনবসতি ও পরিকাঠামোর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
চাকুং নদী ও তিস্তার সংযোগস্থলে ধসের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি তাই প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। আশঙ্কা ছিল, উপর দিক থেকে আসা জল যদি বাধার পিছনে জমতে থাকে, তা হলে ধীরে ধীরে সেখানে বড় জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সেই জলাধারের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে আচমকা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে এই ধরনের আকস্মিক জলপ্রবাহকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়।
পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপও করা হয়েছিল। নর্থ সিকিম থেকে বাংলার কালীঝোরা পর্যন্ত তিস্তার উপর থাকা সাতটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যারাজ থেকে জল ছেড়ে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, নদীর জলধারণ ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য জলচাপ কিছুটা কমিয়ে রাখা। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে আপাতত বড় কোনও বিপর্যয় ঘটেনি।
তবে মঙ্গলবার সরকারি আধিকারিকেরা ধস কবলিত এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন। তাঁদের নজরে আসে, ধসের জায়গায় সত্যিই একটি ছোট জলাশয় বা লেকের মতো অংশ তৈরি হতে শুরু করেছে। যদিও সেটি এখনও আকারে অনেকটাই ছোট, তবুও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের উপর ধসের প্রভাব এবং সেখানে জল জমার বিষয়টি প্রশাসনের নজর এড়ায়নি। পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
একদিকে খেচিপেরিতে নতুন কাদাধস, অন্য দিকে চাকুং–তিস্তা এলাকায় ধসের জেরে জল জমার সম্ভাবনা—দুই ঘটনায়ই সিকিমের পাহাড়ি পরিবেশের ঝুঁকি ফের সামনে এসেছে। বিশেষ করে পর্যটন মরসুমে পাহাড়ি রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত যেমন ব্যাহত হয়, তেমনই স্থানীয় ব্যবসা ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ে।
প্রশাসনের মূল লক্ষ্য এখন একদিকে রম্ভি–খেচিপেরি সড়ক দ্রুত মেরামত করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা, অন্য দিকে চাকুং নদী ও তিস্তার সংযোগস্থলে তৈরি হওয়া জলাশয়ের পরিস্থিতির উপর নজর রাখা। পাহাড়ে ফের বৃষ্টি হলে নতুন করে ধস নামার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সিকিমের মতো পাহাড়ি অঞ্চলে রাস্তা, নদী ও বসতির অবস্থান অনেকটাই প্রকৃতিনির্ভর। ফলে একটি জায়গায় পাহাড় ধসের প্রভাব দ্রুত অন্য এলাকায় পৌঁছতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেই বাস্তবতাই আরও এক বার মনে করিয়ে দিচ্ছে। খেচিপেরির রাস্তা কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এবং চাকুং–তিস্তা এলাকায় তৈরি হওয়া জলাশয় শেষ পর্যন্ত কতটা বড় আকার নেয়, এখন সে দিকেই নজর প্রশাসনের। আপাতত বড় বিপদ এড়ানো গেলেও পরিস্থিতিকে হালকা ভাবে দেখছে না সিকিম সরকার ও বিপর্যয় মোকাবিলা সংস্থা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments