
নিউজ ডেস্ক; স্ত্রীকে নৃশংস ভাবে খুন করে তাঁর মাথা ফ্রিজে লুকিয়ে রাখার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই মামলার তদন্ত যখন এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হল অভিযুক্ত রামানুজ গোস্বামীর। সোমবার ভোরে মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য তাঁকে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে হাটিগাঁও থানায় ফেরানোর পথে চলন্ত পুলিশের গাড়ি থেকে তিনি ঝাঁপ দেন বলে পুলিশের দাবি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
রামানুজের মৃত্যু ঘিরে ইতিমধ্যেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের গাড়ির ভিতরে থাকা অবস্থায় কী ভাবে তিনি আচমকা বাইরে ঝাঁপ দেওয়ার সুযোগ পেলেন, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার ভোরে রামানুজকে মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে তাঁকে ফের হাটিগাঁও থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সেই সময় পুলিশের গাড়িটি নারকাসুর পাহাড়ি এলাকার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশের দাবি, আচমকাই রামানুজ কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের উপর হামলা চালানোর চেষ্টা করেন। এর পরেই চলন্ত গাড়ির দরজা দিয়ে ঝাঁপ দেন তিনি।
রাস্তার পাশের একটি খাদে পড়ে গুরুতর আহত হন রামানুজ। সঙ্গে থাকা পুলিশকর্মীরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
রামানুজের বিরুদ্ধে তাঁর ২৫ বছরের স্ত্রী রিয়া তালুকদারকে খুনের অভিযোগ উঠেছিল। তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটির হাটিগাঁও এলাকায় তাঁদের ফ্ল্যাটেই ঘটনাটি ঘটে বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তদন্তকারীদের দাবি, স্ত্রীকে খুন করার পর তাঁর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছিল। মাথা এবং হাতের কয়েকটি আঙুল দেহ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ। এরপর রিয়ার মাথা একটি কালো পলিথিনের ব্যাগে মুড়ে ফ্রিজের ভিতরে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
ঘটনাটি সামনে আসে প্রতিবেশীদের সন্দেহের জেরে। ফ্ল্যাট থেকে বেশ কিছু দিন ধরে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল বলে তাঁরা পুলিশকে জানান। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকেই রিয়ার দেহ উদ্ধার হয় বলে জানা যায়। পরে তদন্তের সূত্র ধরে তাঁর স্বামী রামানুজকে গ্রেফতার করা হয়।
তবে রামানুজ ঠিক কবে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে আলাদা তথ্য রয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, ৬ সেপ্টেম্বর তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এর পর তাঁকে আদালতে তোলা হলে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্তকারীদের জেরায় রামানুজ স্ত্রীকে নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তাঁর দাবি ছিল, রিয়া অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। স্ত্রী তাঁকে প্রতারণা করছেন—এমন সন্দেহ থেকেই তাঁর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছিলেন রামানুজ।
পুলিশের দাবি, ঘটনার সময় রামানুজ মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। তাঁর ফ্ল্যাট থেকে বেশ কয়েকটি খালি মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা একটি রক্তমাখা দাও-ও উদ্ধার করা হয়।
তদন্তের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকগুলির একটি ছিল, ঘটনার পর রামানুজ নিজের কাজের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেননি বলে পুলিশের দাবি। বরং রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বলে তিনি যাঁকে সন্দেহ করতেন, তাঁকেও খুন করার হুমকি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
পুলিশকে রামানুজ নাকি জানিয়েছিলেন, জেল থেকে বেরিয়ে ওই ব্যক্তিকে তিনি খুন করবেন। তাঁর এই বক্তব্য তদন্তকারীদের কাছে আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল বলে জানা যায়।
এ দিকে, রিয়ার পরিবারের তরফে রামানুজের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি এবং অতীতে অপরাধমূলক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগও করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের একটি আর্থিক প্রতারণার মামলায় রামানুজ গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তবে অতীতের ওই অভিযোগগুলির সত্যতা এবং তার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা আলাদা ভাবে খতিয়ে দেখছিল পুলিশ।
স্ত্রীকে খুনের অভিযোগে রামানুজের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছিল। আদালতের নির্দেশে পুলিশ হেফাজতেই ছিলেন তিনি। সেই অবস্থাতেই সোমবার ভোরের ঘটনা তদন্তে নতুন মোড় এনে দিয়েছে।
এক দিকে রিয়া তালুকদার হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা, অন্য দিকে অভিযুক্তের হেফাজতে মৃত্যু—দুই ঘটনাই এখন তদন্তকারীদের সামনে আলাদা প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে পুলিশের গাড়ি থেকে রামানুজ কী ভাবে ঝাঁপ দেওয়ার সুযোগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, নারকাসুরের পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় আচমকা পুলিশকর্মীদের উপর হামলার চেষ্টা করেন রামানুজ। পরিস্থিতির মধ্যে তিনি চলন্ত গাড়ি থেকে ঝাঁপ দেন। কিন্তু পুলিশের নিরাপত্তায় থাকা একজন হেফাজতে থাকা অভিযুক্ত কী ভাবে এমন সুযোগ পেলেন, সেই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
রামানুজের মৃত্যুর পর এখন তাঁর বিরুদ্ধে চলা হত্যাকাণ্ডের তদন্তও নতুন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। রিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় যে সমস্ত তথ্য, ফরেন্সিক প্রমাণ এবং সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে পুলিশকে।
একই সঙ্গে রামানুজের মৃত্যুর ঘটনাটিও আলাদা ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চলন্ত পুলিশের গাড়িতে ঠিক কী ঘটেছিল, গাড়িতে কত জন পুলিশকর্মী ছিলেন, অভিযুক্ত কী ভাবে দরজা পর্যন্ত পৌঁছলেন এবং তাঁকে আটকানোর চেষ্টা কী হয়েছিল—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
অর্থাৎ, রিয়া তালুকদার হত্যাকাণ্ডের রহস্যের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আরও একটি রহস্যের জন্ম দিল রামানুজের মৃত্যু। স্ত্রীকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ওই যুবকের পুলিশের হেফাজতেই মৃত্যু এখন গুয়াহাটির তদন্তে নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments