
নিউজ ডেস্ক;শনিবার সন্ধ্যার ভয়াবহ খুনের পর থেকেই বদলে গিয়েছে পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠের দুলমির রামকৃষ্ণ পল্লির পরিবেশ। যে পাড়াকে এত দিন শান্ত ও নির্বিবাদী বলেই চিনতেন স্থানীয়রা, সেখানেই এখন আতঙ্কের ছায়া। মেসের দোতলার একটি ঘরে ১৯ বছরের তরুণীকে খুনের ঘটনার পর সোমবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি এলাকা। যে ঘরে খুনের ঘটনা ঘটেছে, সেটি আগেই সিল করে দিয়েছিল পুলিশ। সোমবারও মেসের দোতলার ওই অংশে পুলিশের সিল অটুট ছিল। মেসের বাইরে বসানো হয়েছে পাহারা। তদন্তের স্বার্থে বাইরের কাউকেই মেসের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
মেসের নীচের তলায় অবশ্য কয়েক জন আবাসিক এখনও রয়েছেন। তাঁরাও কার্যত ঘরবন্দি। দরজা বন্ধ করেই থাকছেন তাঁরা। এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের একাংশের বক্তব্য, জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় একের পর এক মেস তৈরি হলেও সেগুলিতে কারা থাকছেন, তাঁদের সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না। ফলে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে গোটা পাড়ার উপর।
স্থানীয় বাসিন্দা রঞ্জিত সিংয়ের কথায়, ‘‘পাড়ায় সবাই আতঙ্কে রয়েছেন। মেস করা নিয়ে পাড়ার মানুষ আপত্তি জানালেও কেউ কানে তোলেনি। বরং কয়েকটি মেসের মালিকের সঙ্গে ঝামেলা পর্যন্ত হয়েছে। মেস হলে কে আসছে বা কী হচ্ছে, কিছুই বোঝা যায় না।’’
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মেসের মালিক নিজে এলাকায় থাকেন না। মাঝেমধ্যে তিনি সেখানে আসেন। ফলে মেসে থাকা আবাসিকদের দৈনন্দিন গতিবিধি সম্পর্কে মালিকেরও সব সময় নজর থাকে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। যদিও এই ঘটনায় মেসের মালিকের বিরুদ্ধে কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আসেনি। খুনের তদন্তে পুলিশ মূলত ঘটনার সময় মেসে কী হয়েছিল, তরুণী সেখানে কেন গিয়েছিলেন এবং কী ভাবে খুনের পর দেহ নিয়ে অভিযুক্ত সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন—সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
দুলমি নডিহা এলাকা টামনা থানার অন্তর্গত। পুলিশ সূত্রে খবর, গত কয়েক বছরে এই এলাকায় জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। পুরুলিয়া শহরের বিস্তৃত অংশ হিসাবেই এখন এই এলাকাকে দেখা হয়। নতুন বসতি গড়ে ওঠার পাশাপাশি বেড়েছে মেসের সংখ্যাও। বিভিন্ন জায়গা থেকে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা অন্য কাজের সূত্রে আসা বহু তরুণ-তরুণী এই ধরনের মেসে থাকেন।
শনিবারের ঘটনার পর ওই এলাকার মেসগুলির উপর নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। কোথায় কত জন থাকেন, তাঁদের পরিচয় কী, মেসে যাতায়াতকারীদের বিষয়ে কোনও তথ্য রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তবে কোনও মেসে থাকা মানেই অপরাধের সঙ্গে যোগ রয়েছে, এমন ধারণা তৈরি না করার কথাও বলছেন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকেরা। তদন্তের পাশাপাশি বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্য দিকে, তরুণী খুনের তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে বলরামপুর থানার পুলিশ। কারণ খুনের পর দেহ নিয়ে মোটরবাইকে পালানোর সময় পুরুলিয়া থেকে বলরামপুরের দিকে যাওয়ার পথে নাকা তল্লাশিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অভিযুক্ত অমিত কুমার মাহাতো। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় তরুণীর দেহ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় দুলমির ওই মেসে ১৯ বছরের তরুণীকে খুনের অভিযোগ উঠেছে বছর একুশের অমিত কুমার মাহাতোর বিরুদ্ধে। মৃতার সঙ্গে অমিতের পরিচয় ছিল বলেই প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার সময় মেসটি প্রায় ফাঁকা ছিল বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যাচ্ছে।
তদন্তে উঠে আসা প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই তরুণী মেসে এসে অমিতের ঘরে ঢোকেন। সেখানে দু’জনের মধ্যে কোনও বিষয় নিয়ে বচসা শুরু হয়। সেই বচসার পরেই পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে গড়ায় এবং তরুণীকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। এর পর নিজের মোটরবাইকে দেহ চাপিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ে অমিত।
দেহ নিয়ে মোটরবাইকে যাওয়ার সময়ই অবশ্য পুলিশের নাকা তল্লাশিতে আটকে যায় সে। বলরামপুর থানার পুলিশ তাকে আটক করার পর মোটরবাইক থেকে তরুণীর দেহ উদ্ধার করে। এরপরই ঘটনা প্রকাশ্যে আসে এবং এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে অমিতকে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। খুনের সঠিক কারণ কী, বচসার সূত্রপাত কোথা থেকে, তরুণী কেন ওই মেসে গিয়েছিলেন এবং ঘটনার আগে বা পরে আর কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না—প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি মেস এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ফুটেজ হাতে এলে তরুণীর মেসে প্রবেশ থেকে শুরু করে অভিযুক্তের বেরিয়ে যাওয়ার গতিপথ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
খুনের ঘটনার পর মেসের দোতলার ঘরটি এখন কার্যত তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। পুলিশের সিল করা সেই অংশে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ঘটনাস্থল থেকে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও নমুনা সংগ্রহের কাজ হয়েছে কি না, তদন্তের স্বার্থে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ দিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ চাইছেন, এলাকায় থাকা মেসগুলির বিষয়ে প্রশাসনের আরও নজরদারি থাকুক। তাঁদের বক্তব্য, শহরের বিস্তার এবং কর্মসূত্রে বাইরে থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেস সংস্কৃতিও বেড়েছে। কিন্তু মেসে কারা থাকছেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয়রা কাকে জানাবেন—এই বিষয়গুলিতে স্পষ্ট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
শনিবারের খুনের ঘটনার পর সেই দাবিই নতুন করে সামনে এসেছে। আপাতত পুলিশের নজর অমিতের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনাস্থলের প্রমাণ সংগ্রহের দিকে। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য হাতে আসার পরেই খুনের পুরো ঘটনাক্রম আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তার আগে পর্যন্ত দুলমির রামকৃষ্ণ পল্লির ওই মেস ঘিরে আতঙ্ক কাটার কোনও লক্ষণ নেই। শান্ত পাড়াটির দৈনন্দিন জীবনেও শনিবারের ঘটনার ছাপ স্পষ্ট।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments