
নিউজ ডেস্ক; নয়াদিল্লিতে শনিবার থেকে শুরু হতে চলেছে দু’দিনের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের আয়োজনে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ঘিরে ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক মহলে তৎপরতা তুঙ্গে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ডি-ডলারাইজেশনের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সম্মেলনের একেবারে মুখে সবচেয়ে বেশি জল্পনা তৈরি হয়েছে চিনকে ঘিরে। প্রশ্ন একটাই—ভারতের মাটিতে ব্রিকসের মঞ্চে কি দেখা যাবে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে?
একাধিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, শনিবার জিনপিং দিল্লিতে না এলেও রবিবার তাঁকে ভারত মণ্ডপমে দেখা যেতে পারে। তবে চিনের তরফে এখনও পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়নি। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জল্পনা অব্যাহত। বেজিং সম্মেলন আয়োজনের জন্য ভারতকে সমর্থন জানালেও চিনের হয়ে ঠিক কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই অনিশ্চয়তাই ব্রিকস সম্মেলনের আগে কূটনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অন্য দিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতি নিশ্চিত বলেই জানা যাচ্ছে। মূল ব্রিকস বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর আলাদা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে সম্মেলনের মঞ্চে রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
তবে নয়াদিল্লির কাছে এবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমীকরণ সম্ভবত চিনকে ঘিরেই। সীমান্তে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন সত্ত্বেও ভারত গত কয়েক মাসে চিনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তাই সীমান্তের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কাঁচামালের সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। হিমালয় শুধু ভারত ও চিনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়, দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ও জলসম্পদের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশগত ভারসাম্য, হিমবাহের পরিবর্তন এবং পাহাড়ি অঞ্চলের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
এর পাশাপাশি রয়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রশ্ন। চিনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লির উদ্বেগের কারণ। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও প্রযুক্তি সরবরাহের ক্ষেত্রে চিনের বিধিনিষেধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে ভারতীয় শিল্পমহলের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে রেয়ার আর্থ মিনারেল-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত এবং সহজ ছাড়পত্র চায় ভারত।
কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক্স, নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে রেয়ার আর্থ মিনারেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিন এই ধরনের কাঁচামাল ও প্রযুক্তিগত উপাদানের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। ফলে সরবরাহে কোনও ধরনের বাধা তৈরি হলে ভারতীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
নয়াদিল্লির আরও একটি দাবি রয়েছে। চিন যাতে ভারতীয় সংস্থার বিনিয়োগের উপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ শিথিল করে, সেই বিষয়টিও আলোচনায় উঠতে পারে। একই ভাবে চিন থেকে ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি এবং বিশেষায়িত কম্পোনেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলি তৈরি হয়েছে, তার সমাধান চায় ভারতীয় শিল্পমহল।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার প্রক্রিয়াও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই ভারতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ভারতের বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়ালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে চিনের বিদেশ মন্ত্রক। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য-সহ একাধিক বিষয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই বৈঠককে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।
বাণিজ্য পরিসংখ্যানেও কিছুটা ইতিবাচক ছবি দেখা যাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে চিনে ভারতের রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই রফতানির পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ৫.৫৫ বিলিয়ন ডলারে। একই সঙ্গে চিনা বিনিয়োগ এবং চিনা সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে ভারতও কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এখনও একাধিক বাধা রয়েছে। সীমান্ত সমস্যা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার মতো বিষয়গুলির কারণে ভারতকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে। ফলে ব্রিকসের মঞ্চে জিনপিং উপস্থিত হলে মোদীর সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য বৈঠক বিশেষ তাৎপর্য পেতে পারে।
তবে চিন-ভারত সম্পর্কই এবারের সম্মেলনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। ব্রিকসকে কোনও ভাবেই পশ্চিম-বিরোধী জোট হিসেবে তুলে ধরতে চায় না নয়াদিল্লি। বরং আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও গ্লোবাল সাউথ তথা উন্নয়নশীল দেশগুলির হয়ে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে চায় ভারত। সেই কারণেই ব্রিকসের মঞ্চকে কৌশলগত ভাবে ব্যবহার করতে চাইছে নয়াদিল্লি।
আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা বাড়ানো, রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি—এই বিষয়গুলিও ভারতের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। ডি-ডলারাইজেশন নিয়েও ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভারত এই প্রক্রিয়াকে কী ভাবে দেখে, তা নিয়েও সম্মেলনে বিশেষ নজর থাকবে।
সব মিলিয়ে এবারের ব্রিকস সম্মেলন ভারতের কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক নয়, বরং একাধিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ। এক দিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্য দিকে চিনের সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা, আবার একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের দাবি—এই তিনটি স্তরেই নয়াদিল্লিকে ভারসাম্য রাখতে হবে।
আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন—শেষ পর্যন্ত শি জিনপিং কি ভারত মণ্ডপমে পা রাখবেন? উত্তর মিলতে পারে সম্মেলনের প্রথম দিনেই। যদি জিনপিং উপস্থিত থাকেন, তবে মোদীর সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য সাক্ষাৎ এবং সেখানে সীমান্ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও হিমালয়ের পরিবেশ নিয়ে কী আলোচনা হয়, তার দিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। আর যদি চিন অন্য কোনও শীর্ষ প্রতিনিধিকে পাঠায়, তা হলেও ব্রিকসের মঞ্চে বেজিংয়ের অবস্থান কোন দিকে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত খুঁজবে কূটনৈতিক মহল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments