
নিউজ ডেস্ক : দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই বাংলার রাজনীতিতে একের পর এক বড় ঘোষণা। ২০২৬-এর পুজো ঘিরে যেমন একাধিক নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে, তেমনই উৎসবের মরসুমেই রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্রে হতে চলেছে উপনির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে আগামী ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ হবে। ফল প্রকাশ এবং গণনা হবে ৯ অক্টোবর। ফলে পুজোর আবহের মধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্য দিকে, দুর্গাপুজোর আয়োজনেও এ বার বেশ কিছু পরিবর্তনের ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। পুজোর সূচনা থেকে বিসর্জন—একাধিক ক্ষেত্রেই পুরনো রীতির বদলে পঞ্জিকা ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কলকাতার রেড রোডে এত দিন যে দুর্গাপুজো কার্নিভাল অনুষ্ঠিত হত, এ বার তা হচ্ছে না। তার পরিবর্তে ইডেন গার্ডেন্সে মহালয়াকে কেন্দ্র করে বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে ড্রোন ও আতশবাজির প্রদর্শনী-সহ দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এ বারের দুর্গাপুজোকে ঘিরে রাজ্য সরকারের ঘোষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ঐতিহ্য এবং পঞ্জিকা। পুজোর সূচনা নিয়ে নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি বিসর্জনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হচ্ছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, দশমীর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করতে হবে। পঞ্জিকা মেনেই নিরঞ্জনের দিন নির্ধারণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রেড রোডের দুর্গাপুজো কার্নিভাল এ বার বাতিল করার সিদ্ধান্তও ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। তার বদলে মহালয়ার সময় ইডেন গার্ডেন্সে বড় আকারের অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চার ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে ড্রোন এবং আতশবাজির প্রদর্শনী থাকবে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মহালয়ার পর ডায়মন্ড হারবার-সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং ছয়টি শহরে দু’দিনের কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
পুজো কমিটিগুলির জন্যও একাধিক নির্দেশিকা রয়েছে। থিমের পুজো করা গেলেও রাজ্যের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের বিষয়টি মাথায় রাখার কথা বলা হয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে ডিজে ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞার কথাও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মহাষ্টমীতে মদ বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
এরই মধ্যে দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার নিয়ে বিতর্কও দানা বেঁধেছে। বাগেশ্বর ধামের ধর্মীয় নেতা ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি বাগেশ্বর বাবা নামে পরিচিত, দুর্গাপুজোর সময়ে মাছ-মাংস এড়িয়ে চলার আবেদন করেছিলেন। তাঁর সেই মন্তব্য ঘিরে বাংলায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়।
বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, বাংলার মানুষ কী খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত অন্য কেউ চাপিয়ে দিতে পারেন না। বাঙালির নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস এবং সংস্কৃতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বাগেশ্বর বাবার পরামর্শের সঙ্গে কার্যত দূরত্ব তৈরি করেছেন।
ফলে দুর্গাপুজোর আগে এই খাদ্যাভ্যাসের বিতর্কও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। বাংলার সংস্কৃতি বনাম বাইরে থেকে আসা খাদ্য-নির্দেশ—এই প্রশ্নকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে, মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে সুজিত মণ্ডল হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে চাঞ্চল্য আরও বাড়ছে। কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর ওই ব্যক্তির দেহের টুকরো উদ্ধারের ঘটনায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তভার CID-এর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সুজিত মণ্ডল ২৮ অগস্ট নিখোঁজ হন। পরিবারের তরফে নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করা হলেও তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে তদন্তে কয়েক জন সন্দেহভাজনের নাম উঠে আসে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের পর তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ, সুজিতকে শ্বাসরোধ করে খুনের পর দেহ একাধিক টুকরো করা হয় এবং বস্তায় ভরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে ফরাক্কার কাছে নদী এলাকায় দেহের অংশ খোঁজার অভিযান চালানো হয়। উদ্ধার হওয়া অংশ DNA পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির অভিযোগও সামনে এসেছে। ধুলিয়ান ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক আধিকারিক এবং সামশেরগঞ্জ থানার এক পুলিশ আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। আরও কয়েক জন পুলিশকর্তার বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। নিহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজনকে চাকরির দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটিকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে CID তদন্তের মাধ্যমে গোটা ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ দিকে দুর্গাপুজোর আবহেই রাজ্যের দুই বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের ঘোষণা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী, নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ হবে। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর।
নন্দীগ্রাম বরাবরই বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অন্য দিকে রেজিনগরও রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে পুজোর আগে এই দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচনের ঘোষণা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচনী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার কথা। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে। ১৭ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র পরীক্ষা এবং ১৯ সেপ্টেম্বর প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনা হবে।
সব মিলিয়ে পুজোর মরসুমের আগে বাংলায় একসঙ্গে একাধিক বড় ঘটনা সামনে এসেছে। এক দিকে দুর্গাপুজোর আয়োজন ও বিসর্জনের নিয়মে পরিবর্তন, অন্য দিকে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য ঘিরে খাদ্যাভ্যাসের বিতর্ক। তার সঙ্গে মুর্শিদাবাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে CID তদন্ত এবং পুজোর আগেই নন্দীগ্রাম-রেজিনগরে উপনির্বাচনের ঘোষণা—সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সরগরম রাজ্য রাজনীতি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments