Last updated: September 7th, 2026 at 04:12 pm

বিশ্বজিৎ ব্যানার্জি ,রানাঘাট : পুলিশি হেফাজত থেকে ফের নাটকীয়ভাবে উধাও হয়ে গেল এক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী যুবক। শারীরিক পরীক্ষার জন্য সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কার্যত পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে চম্পট দিল সে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে নদিয়া জেলার হাঁসখালি থানা এলাকার বগুলা গ্রামীণ হাসপাতালে। অভিযুক্ত যুবকের নাম বিল্লাল হোসেন (১৯)। স্থানীয় সূত্রে খবর, শৌচকর্মের অজুহাত দেখিয়ে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের নজর এড়িয়ে নিমেষের মধ্যে হাসপাতাল চত্বর থেকে পালিয়ে যায় সে। এই আকস্মিক পলায়নের ঘটনায় জেলা পুলিশের ভূমিকা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহলে।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। নদিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে বেআইনিভাবে প্রবেশের অভিযোগে হাঁসখালি থানার পুলিশ বিল্লাল হোসেনকে গ্রেফতার করে। সরকারি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ধৃত যেকোনো অভিযুক্তকে আদালতে পেশ করার আগে সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে শারীরিক পরীক্ষা (মেডিক্যাল টেস্ট) করানো বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম মেনেই পুলিশের একটি দল বিল্লালকে বগুলা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালে প্রাথমিক নথিপত্র তৈরির কাজ চলাকালীনই ধৃত যুবক জানায় যে তার প্রচণ্ড প্রস্রাবের বেগ পেয়েছে এবং সে শৌচাগারে যেতে চায়। যুবকের কথায় বিশ্বাস করে পুলিশকর্মীরা তাকে হাসপাতালের শৌচাগারের দিকে যাওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলেও সে ফিরে না আসায় সন্দেহ জাগে সঙ্গে থাকা পুলিশকর্মীদের। শৌচাগারের দরজা খুলে দেখা যায় ভেতরটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। হাসপাতালের পেছনের দিকের একটি জানলা বা খোলা পথ দিয়ে ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গিয়েছে ওই অভিযুক্ত।
মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতাল চত্বরে শোরগোল পড়ে যায়। খবর দেওয়া হয় হাঁসখালি থানায়। তড়িঘড়ি অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে আশপাশের এলাকায় চিরুনি তল্লাশি শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে সে লোকালয় পেরিয়ে গা-ঢাকা দিতে সক্ষম হয়েছে। হাসপাতালের সাধারণ রোগী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এমন একটি জনবহুল জায়গা থেকে পুলিশের হেফাজত এড়িয়ে এক বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় চিকিৎসা পরিষেবায় সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, যেখানে একজন আন্তর্জাতিক অনুপ্রবেশকারীকে কড়া পাহারায় রাখা উচিত ছিল, সেখানে পুলিশের এই চরম অসাবধানতা ও নজরদারির অভাব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
উদ্বেগের বিষয় হলো, নদিয়া জেলায় পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ঠিক দু’দিন আগেই অনুরূপ এক ঘটনায় পুলিশের হাত ফস্কে পালিয়ে গিয়েছিল আরও দুই বাংলাদেশি নাগরিক। যাদের মধ্যে পরবর্তীকালে একজনকে পুনরায় পাকড়াও করা সম্ভব হলেও অন্য জনের হদিস এখনও মেলেনি। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বগুলা গ্রামীণ হাসপাতালের এই নতুন কাণ্ড জেলা পুলিশের নজরদারি ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি করেছে। কেন একজন ধৃত ব্যক্তির সঙ্গে যথাযথ হ্যান্ডকাফ বা উপযুক্ত নজরদারি ছিল না, তা নিয়ে স্থানীয় স্তরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সীমান্ত লাগোয়া সংবেদনশীল জেলায় বারবার এই ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি কীভাবে ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরাও।
নদিয়ার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশ রোখা যেমন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনই ভারতীয় ভূখণ্ডে ধরা পড়ার পর অনুপ্রবেশকারীদের সুরক্ষিত হেফাজতে রাখা ও আইনি নিষ্পত্তি করা স্থানীয় পুলিশের অন্যতম বড় দায়িত্ব। কিন্তু পরপর কাস্টডি থেকে পলায়নের নজির সীমান্ত এলাকার সার্বিক সুরক্ষাব্যবস্থার ফাঁকফোকরকেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে। হাঁসখালি থানার এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তাও বিভাগীয় পর্যায়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে হাঁসখালি, রানাঘাট ও পার্শ্ববর্তী সমস্ত থানা এলাকায় হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও সীমান্তমুখী সড়কগুলিতে নাকা চেকিং শুরু হয়েছে পলাতক বিল্লাল হোসেনের সন্ধানে। তবে বারবার একই ধরনের ব্যর্থতা জেলা পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments