
নিউজ ডেস্ক: বিশ্বের মানচিত্র নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণায় বড়সড় বদলের পথে রাষ্ট্রপুঞ্জ। ১৬ শতক থেকে বহুল ব্যবহৃত Mercator projection-এর বদলে তুলনামূলক ভাবে ভূখণ্ডের প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিল রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভা। শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আফ্রিকার দেশ টোগোর নেতৃত্বে আনা ‘Correct the Map’ প্রস্তাবটি ১৬৪টি দেশের সমর্থনে পাশ হয়েছে। প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে একমাত্র আমেরিকা। ছ’টি দেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন জরুরি। রাষ্ট্রপুঞ্জ কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্রকে আইন করে বাধ্যতামূলক করেনি এবং Mercator মানচিত্রও নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং শিক্ষাক্ষেত্র, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল মানচিত্রে Equal Earth-এর মতো equal-area projection ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ পুরনো মানচিত্র বাতিল করে নতুন মানচিত্র বাধ্যতামূলক করল’—এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রস্তাবটি আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলকও নয়।
পৃথিবী গোলাকার। কিন্তু কাগজ বা সমতল পর্দায় পৃথিবীর মানচিত্র দেখাতে গেলে কোনও না কোনও ধরনের বিকৃতি অনিবার্য। ১৫৬৯ সালে কার্টোগ্রাফার Gerardus Mercator যে projection তৈরি করেছিলেন, সেটি মূলত নৌ-পরিবহণ ও দিকনির্দেশের কাজে অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু এর একটি বড় সমস্যা হল—ভূ-মধ্যরেখা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, মানচিত্রে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল তত বড় দেখায়।
ফলে উত্তর মেরুর কাছাকাছি গ্রিনল্যান্ডকে মানচিত্রে আফ্রিকার প্রায় সমান আকারের বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে কিন্তু আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ। অর্থাৎ নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা হঠাৎ করে বড় হয়ে যাচ্ছে না; বরং মানচিত্রে তার প্রকৃত আপেক্ষিক আয়তন আরও সঠিক ভাবে ফুটে উঠবে।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে Equal Earth projection। ২০১৮ সালে তৈরি এই projection পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের আপেক্ষিক আয়তনকে তুলনামূলক ভাবে সঠিক রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা-সহ নিরক্ষীয় অঞ্চলের মহাদেশগুলি Mercator মানচিত্রের তুলনায় তাদের প্রকৃত আকারের কাছাকাছি দেখা যায়।
এই মানচিত্র পরিবর্তনের প্রচারের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা টোগো। আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনও রয়েছে এই উদ্যোগে। টোগোর বক্তব্য, মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্য দেখায় না, পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের মানসিক ধারণাও তৈরি করে। তাই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এমন একটি projection, যেখানে আফ্রিকার আয়তন তুলনামূলক ভাবে ছোট দেখায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের ভোটে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আমেরিকা একমাত্র দেশ হিসেবে বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। সার্বিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা এবং ইউক্রেন ভোটদানে বিরত থেকেছে।
আমেরিকার পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে একটি ‘ideological agenda’-র সঙ্গে যুক্ত বলে সমালোচনা করা হয়েছে। অন্য দিকে টোগো ও আফ্রিকান সমর্থকদের বক্তব্য, এটি কোনও দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং পৃথিবীর ভূগোলকে আরও সঠিক ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা।
এখানেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে আগামী দিন থেকেই বিশ্বের সমস্ত মানচিত্র থেকে Mercator projection অদৃশ্য হয়ে যাবে। বিশেষ করে সামুদ্রিক ও বায়ু-নৌচালনার ক্ষেত্রে Mercator projection এখনও কার্যকর। কারণ দিকনির্দেশ এবং নেভিগেশনের ক্ষেত্রে এর বিশেষ সুবিধা রয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রস্তাবও এই ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করছে না।
বরং লক্ষ্য হল সাধারণ বিশ্বমানচিত্র, স্কুলের ভূগোলের বই, শিক্ষামূলক উপকরণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এমন projection-এর ব্যবহার বাড়ানো, যাতে বিভিন্ন মহাদেশের আয়তন সম্পর্কে মানুষের ধারণা বাস্তবতার কাছাকাছি থাকে।
টোগো ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা চলতি বছরের শেষের মধ্যে নিজেদের স্কুলের ভূগোলের বই ও মানচিত্রে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি অন্য দেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও এই ধরনের projection ব্যবহারে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, আফ্রিকা নতুন মানচিত্রে ‘বড়’ হয়ে যাচ্ছে না—মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে আরও সঠিক ভাবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। শতাব্দীপ্রাচীন Mercator projection-এর পাশাপাশি Equal Earth-এর মতো বিকল্প projection ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বকে কী ভাবে দেখা হবে, সেই বিতর্কই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন মাত্রা পেল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments