
নিউজ ডেস্ক : নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ধসের পর কেটে গিয়েছে প্রায় নয় দিন। চারদিকে তখনও ধ্বংসস্তূপ, কাদা, পাথর আর বিপর্যয়ের চিহ্ন। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই এল অবিশ্বাস্য স্বস্তির খবর। ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের গভীরে আটকে থাকা দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করলেন উদ্ধারকারীরা। শুক্রবার তাঁদের টানেলের ভিতর থেকে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। তবে অভিযান এখনও শেষ হয়নি। টানেলের আরও ভিতরে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে উদ্ধারকারী দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোতের সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ কাদা, বোল্ডার, পাথর এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। সেই ধাক্কায় প্রকল্পের টানেলের প্রবেশপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। টানেলের ভিতরে প্রায় ১৭০ মিটার গভীরে কয়েক জন শ্রমিক আটকে পড়েছেন বলে জানা যায়। তাঁদের উদ্ধারে শুরু হয় জোরদার অভিযান।
দিন-রাত এক করে কাজে নামে নেপাল সেনা, প্রযুক্তিবিদ এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল। টানেলের মুখের সামনে জমে থাকা বিশাল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভিতরে পৌঁছনোটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ পাহাড়ি এলাকায় ধসের পরে শুধু মাটি সরালেই পথ তৈরি হয় না। বড় বড় বোল্ডার, পাথর এবং শক্ত হয়ে থাকা কাদার স্তরও সরাতে হয়। সামান্য ভুল পদক্ষেপেই নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা থাকে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, টানেলের মুখের সামনে প্রায় ৪০ মিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ২০ মিটার উঁচু ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছিল। ফলে উদ্ধারকারীদের কাছে প্রথম কাজ ছিল নিরাপদে প্রবেশের রাস্তা তৈরি করা। সেই কাজ করতে গিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হয়েছে তাঁদের। টানেলের ভিতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়াও ছিল কঠিন। কোথায় জল জমে রয়েছে, কোথায় ধ্বংসাবশেষ আটকে আছে কিংবা কোনও অংশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখতে হয়েছে।
দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের পর স্বাভাবিক ভাবেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে—এত দিন টানেলের ভিতরে থেকেও কী ভাবে তাঁরা বেঁচে রইলেন?
ভূগোলবিদদের মতে, এর সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে টানেলের ভিতরে তৈরি হওয়া ‘এয়ার পকেট’, অর্থাৎ সীমিত পরিসরে আটকে থাকা বায়ুস্তর। তবে এটি এখনও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, নিশ্চিত কারণ নয়।
পাহাড়ি বন্যার চরিত্র সমতলের বন্যার তুলনায় একেবারেই আলাদা। প্রবল স্রোতের সঙ্গে এখানে শুধু জল নামে না। জলের সঙ্গে ছুটে আসে পাথর, বোল্ডার, মাটি, কাদা ও পলি। ফলে কোনও সুড়ঙ্গের একটি অংশ ধ্বংসাবশেষে আটকে গেলে তার পিছনের অংশ সব সময় সম্পূর্ণ জলে ডুবে যাবে, এমনটা নয়। টানেলের কোনও অংশ যদি তুলনামূলক ভাবে শুকনো থেকে যায় এবং সেখানকার বাতাস পুরোপুরি বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে, তা হলে সাময়িক ভাবে মানুষের শ্বাস নেওয়ার মতো বায়ু সেখানে থেকে যেতে পারে।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইন্দ্রজিৎ রায় চৌধুরীর বিশ্লেষণও সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। তাঁর মতে, পাহাড়ি নদীর বন্যায় বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও পলি দ্রুত গতিতে নেমে আসে। ফলে কোনও জায়গার প্রবেশপথ ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে গেলেও তার পিছনে তুলনামূলক বদ্ধ এবং শুকনো জায়গা তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় থাকা বাতাসই আটকে পড়া মানুষের দীর্ঘ সময় টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
উদ্ধার অভিযানে সবচেয়ে বড় আশার আলো দেখা যায় যখন টানেলের ভিতর থেকে মানুষের আওয়াজ শোনা যায়। শুধু শব্দ শোনাই নয়, উদ্ধারকারীরা ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগও স্থাপন করতে সক্ষম হন। তাঁদের আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। ভিতর থেকেও সাড়া মেলে।
এর পরই উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়। ধীরে ধীরে ভিতরের দিকে এগোনোর পাশাপাশি বড় বড় বোল্ডার সরানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। উদ্ধারকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নয় দিন ধরে বন্ধ থাকা টানেলের ভিতরের কাঠামো কতটা নিরাপদ, সে বিষয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়।
শেষ পর্যন্ত সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়। সঞ্জয় শাহ এবং কবির মহারাজন নামে দুই শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় টানেল থেকে বাইরে বের করে আনতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা। তাঁদের উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বস্তি নেমে আসে সংশ্লিষ্ট মহলে।
তবে এখানেই অভিযান থামছে না। টানেলের আরও গভীরে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখছেন উদ্ধারকারীরা। প্রয়োজনে আরও বোল্ডার সরিয়ে টানেলের গভীর অংশে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হবে।
এই ঘটনা হিমালয়ের দুর্যোগের প্রকৃতি নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাহাড়ি নদীর খাড়া গতিপথের কারণে আকস্মিক বন্যার সময় জলের গতি অত্যন্ত বেশি হয়। তার সঙ্গে পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মিশে গেলে সেই স্রোতের ধ্বংসক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তা, সেতু কিংবা কোনও নির্মাণ প্রকল্পের প্রবেশপথ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ঘটনাতেও তারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। এক দিকে বাইরে প্রবল বন্যা ও ধস, অন্য দিকে অন্ধকার টানেলের গভীরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। তার মধ্যেই উদ্ধারকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য—নয় দিন পরেও দুই শ্রমিকের জীবিত সন্ধান পাওয়া।
এই ঘটনাকে তাই শুধু একটি সফল উদ্ধার অভিযান হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। টানেলের বায়ুপ্রবাহ, ধ্বংসস্তূপের অবস্থান, বন্যার গতিপথ এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও প্রকৃতির তৈরি কোনও একটি ছোট ‘নিরাপদ জায়গা’ কী ভাবে মানুষের জীবন রক্ষার সুযোগ করে দিতে পারে, ত্রিশুলি-৩-এর ঘটনা তারই বিরল উদাহরণ।
নয় দিন পর দুই শ্রমিকের ফিরে আসা তাই নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে উদ্ধারকারীদের কাজ এখনও শেষ হয়নি। টানেলের ভিতরে আরও কেউ জীবিত রয়েছেন কি না, তাঁদের কোনও সন্ধান মেলে কি না—এখন সেই দিকেই তাকিয়ে সকলের নজর।
nepal-trishuli-3-hydropower-tunnel-two-workers-rescued-after-nine-days-flood
Realistic photorealistic Indian-Nepal Himalayan news scene, professional newspaper photojournalism style showing a dramatic rescue operation at the entrance of Trishuli-3 hydropower project tunnel after devastating floods and landslides, Nepal Army and trained rescue workers clearing massive rocks, mud and debris from a blocked tunnel entrance, two rescued adult male workers being safely escorted out by rescue personnel, rugged Himalayan terrain, wet muddy environment, emergency equipment, natural overcast daylight, documentary realism, restrained emotional atmosphere, highly detailed, no graphic injuries, no blood, no readable text, no logos, no watermark, realistic proportions, cinematic but authentic news photography, 16:9 aspect ratio, 1920×1080 resolution.
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments