Last updated: September 5th, 2026 at 03:14 pm

নিউজ ডেস্ক; দামোদরের জল ঢুকে পড়েছে একের পর এক গ্রামে। কোথাও বাড়ির নীচতলা জলের তলায়, কোথাও আবার রাস্তার উপর হাঁটুজল। জলবন্দি মানুষের একাংশ আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণ শিবিরে, কেউ বা বাড়ির ছাদে ত্রিপল টাঙিয়ে কোনও মতে দিন কাটাচ্ছেন। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর, আমতা এবং হুগলির খানাকুল-সহ একাধিক এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। উদয়নারায়ণপুরে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষ বিভিন্ন ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। অন্য দিকে, প্রয়োজন মতো সব জায়গায় ত্রাণ পৌঁছচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ। ফলে খাবার ও পানীয় জলের ঘাটতি নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার সকালেও বন্যার দাপট দেখা গিয়েছে। দামোদরের বাঁধ উপচে হরিহরপুর, হোদল, শিবাণীপুর, কুড়চি, টোকাপুর-সহ একাধিক গ্রামে জল ঢুকছে। বহু বাড়ির ভিতরেও জল ঢুকে পড়েছে। ধানজমি ও আনাজের খেত জলের তলায় চলে গিয়েছে। উদয়নারায়ণপুর থেকে ডিহিভূরসুট যাওয়ার রাস্তায় হাঁটুজল জমে থাকায় যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। এমনকি কোল্ড স্টোরেজেও জল ঢুকেছে বলে জানা গিয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে উদয়নারায়ণপুরে প্রশাসনের তরফে মোট ছ’টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুদের জন্যও খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। টোকাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ষাটোর্ধ্ব আশা ঘোড়ুই। তাঁর কথায়, “দামোদরের পাশে আমার ঝুপড়ি বাড়ি। পাশে একটি গোয়াল ঘরও আছে। সেখানে এখন কোমরসমান জল। আমি ও আমার স্বামী দু’টি গোরুকে নিয়ে ত্রাণ শিবিরে এসেছি। গোরু দু’টিকে রাস্তার পাশে বেঁধে রেখেছি।” তাঁর এই কথাতেই স্পষ্ট, শুধু মানুষের আশ্রয় নয়, গবাদি পশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াও বহু পরিবারের কাছে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাওড়ার জেলাশাসক দীপাপ্রিয়া পি এ দিন উদয়নারায়ণপুর ব্লকের বেশ কয়েকটি বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্য পুলিশের আইজি (দক্ষিণবঙ্গ) কঙ্করপ্রসাদ বারুই, হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এসপি অমিত ভার্মা, উলুবেড়িয়ার এসডিও মানস কুমার মণ্ডল এবং আমতার বিধায়ক অমিত সামন্ত। পরিদর্শনের পরে জেলাশাসক বলেন, “বন্যার ফলে চাষবাসের কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসনের তরফে সব রকমের পদক্ষেপ করা হয়েছে। ত্রাণ শিবিরগুলিতে পর্যাপ্ত খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী মজুত রাখা আছে।”
উদয়নারায়ণপুরের পাশাপাশি আমতা ২ নম্বর ব্লকের ভাটোরা ও ঘোড়াবেড়িয়া চিৎনান গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাও জলমগ্ন। বহু জায়গায় রাস্তায় জল জমে থাকায় সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হুগলির খানাকুল ১ নম্বর ব্লকের জগৎপুর, মাড়োখানা, সুন্দরপুর, হানুয়া, ঢলডাঙা এবং ধান্যঘোরি গ্রাম পঞ্চায়েতের বহু গ্রামও জলের তলায়। বাড়ির নীচতলা ডুবে থাকায় অনেকে ছাদে ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সব জায়গায় প্রয়োজনমতো ত্রাণ পৌঁছয়নি। ফলে প্লাবিত গ্রামগুলিতে খাবার ও পানীয় জলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
জল বাড়ায় বিপদের আশঙ্কায় বন্ধ করে দিতে হয়েছে বহু স্কুল। খানাকুলের মাড়োখানা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন মাড়োখানা উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের মধ্যেও জল ঢুকে গিয়েছে। ফলে আপাতত পঠনপাঠন বন্ধ রয়েছে। মাড়োখানা থেকে পানশিউলি যাওয়ার রাস্তাটিও জলের তলায়। এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, “বাড়ির বাইরে কোমরসমান জল। রাস্তা দিয়ে যান চলাচল প্রায় বন্ধ। জরুরি প্রয়োজনেও বাইরে বেরোতে পারছি না।”
নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় শুক্রবার থেকে খানাকুলের সমস্ত ফেরি পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এর ফলে নদীপথে যাতায়াতের উপর নির্ভরশীল মানুষের সমস্যাও বেড়েছে। খানাকুলের টোকাপুরের বাসিন্দা জিন্না আলি রহমান বলেন, “কয়েক বছর ছাড়াই আমাদের এখানে বন্যা হয়। আমাদের বাড়িঘর, চাষের জমি সব জলের তলায় চলে যায়। সরকার অনেক কিছু করছে ঠিকই, কিন্তু প্রতি বছর বন্যা হয়েই যাচ্ছে।” তাঁর কথায়, বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসনিক উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে।
হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি শুক্রবার আরামবাগ ও খানাকুলের বেশ কিছু এলাকায় গিয়ে বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিধায়কেরা। পরিদর্শনে বেরোনোর আগে আরামবাগের মহকুমাশাসকের দপ্তরে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও ভার্চুয়াল বৈঠকে যোগ দেন জেলাশাসক। তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে এলাকা পরিদর্শন করে এসেছি। নদীবাঁধের উপরে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে।”
হাওড়া ও হুগলির বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর ও আমতার অল্প কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডিএম, এসপি কাজ করছেন। আমতার বিধায়ক অমিত সামন্তও এলাকায় রয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা পরিস্থিতি সামলে নেব। জল ছাড়ার মাত্রাও আজ থেকে কমছে, বৃষ্টিও কমেছে। যদি আর নতুন করে বৃষ্টি না হয়।” হুগলি গ্রামীণেও একাধিক ব্লক ও গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শুক্রবার থেকে ডিভিসি জল ছাড়ার পরিমাণ কমানোয় পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে নতুন করে বৃষ্টি হলে বা নদীর জলস্তর ফের বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই নদীবাঁধের উপর নজরদারি, ত্রাণ শিবিরে খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী মজুত রাখা এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেওয়ার কাজ চলছে। আপাতত প্লাবিত এলাকার মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments