
নিউজ ডেস্ক : চৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিধন্য নবদ্বীপ ধাম। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বৈষ্ণব সংস্কৃতির জন্য গোটা দেশের কাছে পরিচিত এই শহর। তবে নবদ্বীপের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি নাম—ক্ষীর লাল দই। ঘনত্ব, স্বাদ এবং তৈরির অভিনব পদ্ধতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্যরসিকদের কাছে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে এই দই। এ বার সেই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নকে সরকারি জিআই (Geographical Indication) তকমা দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে নদিয়ায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ বাসিন্দা—একই দাবি, কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া-সরভাজার মতো নবদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর লাল দইয়েরও সরকারি স্বীকৃতি প্রয়োজন। তাঁদের বক্তব্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই বিশেষ খাদ্যশিল্প শুধু নবদ্বীপের রসনার ঐতিহ্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের জীবিকা।
নবদ্বীপের লাল দইয়ের বিশেষত্ব শুধু তার লালচে রং বা মিষ্টি স্বাদে নয়। এর আসল বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে তৈরির পদ্ধতিতে। স্থানীয় দই ব্যবসায়ী গোবিন্দ ঘোষের দাবি, ঐতিহ্য মেনে সাধারণত খাঁটি মোষের দুধ ব্যবহার করে এই দই তৈরি করা হয়। প্রথমে দুধ দীর্ঘক্ষণ ধরে জ্বাল দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে দুধ ঘন হয়ে ক্ষীরের মতো অবস্থায় পৌঁছয়।
এই প্রক্রিয়াই এই দইকে অন্য সাধারণ দইয়ের তুলনায় আলাদা করে দেয় বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। তাঁদের বক্তব্য, বিকেল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত টানা দুধ জ্বাল দেওয়ার পর তাতে পাওয়া যায় বিশেষ ঘনত্ব ও সুবাস। দুধ থেকে যখন ক্ষীরের মতো ঘন ভাব এবং নির্দিষ্ট সুবাস বের হয়, তখন শুরু হয় দই পাতার প্রক্রিয়া।
এর পর সেই ঘন দুধ মাটির পাত্রে ঢেলে দই জমতে দেওয়া হয়। গোবিন্দের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পাত্রের দই সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত হতে আড়াই থেকে তিন দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ বাজারে দ্রুত তৈরি করে বিক্রি করার সাধারণ দইয়ের সঙ্গে এর প্রস্তুতপ্রণালীর ফারাক যথেষ্ট।
আর এই দইয়ের ঘনত্ব নিয়েই রয়েছে নবদ্বীপের বহুল প্রচলিত বিশেষত্ব—হাঁড়ি উপুড় করে দিলেও দই সহজে গড়িয়ে পড়ে না। ঘন, মসৃণ এবং ক্ষীরের মতো স্বাদের কারণেই এই দইয়ের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় বাজারের গণ্ডি অনেক আগেই পেরিয়েছে নবদ্বীপের ক্ষীর লাল দই। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি দেশের একাধিক বড় শহরেও এই দইয়ের নিয়মিত চাহিদা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
বেঙ্গালুরু, চেন্নাই এবং দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নবদ্বীপের দই পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, বিদেশে থাকা প্রবাসী বাঙালিরাও অনেক সময় নবদ্বীপে এলে সঙ্গে করে এই দই নিয়ে যান বলে স্থানীয় মহলের দাবি।
ফলে এই মিষ্টান্নকে ঘিরে শুধু স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিই নয়, তৈরি হয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক পরিসরও। দই তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগর, দুধ সরবরাহকারী, মাটির পাত্র প্রস্তুতকারী থেকে শুরু করে বিক্রেতা এবং পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই ব্যবসার উপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমিত সাহার বক্তব্য, কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া ও সরভাজা যদি তাদের ঐতিহ্যের জন্য জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে, তা হলে নবদ্বীপের বহু পুরনো ক্ষীর লাল দইও একই ধরনের স্বীকৃতির দাবিদার।
তাঁর মতে, নবদ্বীপের এই বিশেষ দইয়ের সঙ্গে এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম জড়িয়ে রয়েছে। তাই এর স্বাতন্ত্র্যকে সরকারি ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে এক দিকে যেমন স্থানীয় ব্যবসা আরও পরিচিতি পাবে, অন্য দিকে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেও সুরক্ষা আসতে পারে।
জিআই স্বীকৃতি কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার সঙ্গে যুক্ত কোনও পণ্য বা তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে আলাদা পরিচয় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। সেই কারণেই নবদ্বীপের ব্যবসায়ী মহলের একাংশ মনে করছেন, সরকারি স্বীকৃতি মিললে এই দইয়ের নাম ব্যবহার করে অন্যত্র নিম্নমানের পণ্য বিক্রির প্রবণতাও ঠেকানো সহজ হতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, নবদ্বীপের নাম এবং জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে অন্য জায়গাতেও লাল দই বিক্রি করা হয়। কিন্তু সেই দই আদৌ নবদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে দুধ জ্বাল দেওয়া, নির্দিষ্ট ঘনত্ব তৈরি করা এবং মাটির পাত্রে দই জমানোর মতো ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। ফলে একই নামে দ্রুত তৈরি নিম্নমানের পণ্য বাজারে চলে এলে প্রকৃত কারিগর এবং ব্যবসায়ীরাই সমস্যায় পড়েন।
জিআই স্বীকৃতি পাওয়া গেলে পণ্যের ভৌগোলিক পরিচয় আরও স্পষ্ট হবে এবং নবদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী দইয়ের নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচিতিও শক্তিশালী হতে পারে বলে তাঁদের আশা।
কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া-সরভাজার স্বীকৃতির প্রসঙ্গ সামনে এনে স্থানীয়দের আশা, নবদ্বীপের ক্ষীর লাল দইও এক দিন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বড় পরিচিতি পাবে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শহরে যার চাহিদা রয়েছে, যথাযথ সরকারি উদ্যোগ পেলে সেই পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও পরিচিত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আবেদন, নথিপত্র এবং যাচাই-বাছাইয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে দাবি উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। নবদ্বীপের এই ঐতিহ্যবাহী দইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ভাবে আবেদন ও তার পরবর্তী প্রক্রিয়া কী ভাবে এগোয়, এখন সেটিই দেখার।
নবদ্বীপের মানুষের আশা, শতবর্ষের পুরনো এই রসনার ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার বদলে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবে। মাটির হাঁড়িতে জমা সেই ঘন লাল দইয়ের স্বাদ যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে রয়েছে, তেমনই সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে তার পরিচয়ও আরও পাকাপোক্ত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments