Last updated: September 4th, 2026 at 02:29 pm

নিউজ ডেস্ক; রাজ্য জুড়ে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিতে খাবারের গুণমান এবং স্বাস্থ্যবিধি খতিয়ে দেখতে অভিযান চালাচ্ছে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। সেই ধারাবাহিক অভিযানেই পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায় সামনে এল একের পর এক চাঞ্চল্যকর অনিয়ম। বৃহস্পতিবার হলদিয়া সিটি সেন্টার এলাকার আটটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে আধিকারিকেরা উদ্ধার করেছেন পচা মাছ, মেয়াদ উত্তীর্ণ দুধ, দই এবং সস। শুধু তাই নয়, একটি রেস্তোরাঁয় বিরিয়ানিতে কৃত্রিম রং বা রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগও ধরা পড়েছে। এর আগের দিন, বুধবার মহিষাদলের একটি হোটেলের ফ্রিজ থেকে উদ্ধার হয়েছিল পচা মাংস।
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের এই অভিযানে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিতে খাবার সংরক্ষণ, রান্নার পদ্ধতি এবং খাদ্যসামগ্রীর মেয়াদ যাচাই করা হয়। আধিকারিকদের দাবি, বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাসি বা নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার ফেলে না দিয়ে তেল-মশলা মাখিয়ে ফের গরম করে ক্রেতাদের পরিবেশন করার প্রবণতা দেখা গিয়েছে। খাবারের স্বাদ ও গন্ধ ঢেকে দিতে অতিরিক্ত মশলা ব্যবহার করা হলেও তাতে খাদ্যের পচন বা জীবাণুর ঝুঁকি কমে না। বরং এই ধরনের খাবার খেয়ে সাধারণ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়া বা নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই হলদিয়া সিটি সেন্টার এলাকায় অভিযান শুরু করেন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকেরা। একে একে আটটি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ঢুকে রান্নাঘর, ফ্রিজ, খাবার রাখার তাক এবং মজুত খাদ্যসামগ্রী পরীক্ষা করা হয়। কোথায় কী ধরনের খাবার রাখা হয়েছে, তার উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ঠিক রয়েছে কি না, সেগুলিও দেখা হয়। এই পরিদর্শনের সময়ই একটি রেস্তোরাঁয় পচা মাছের সন্ধান মেলে। মাছটি কত দিন ধরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং তা রান্নার কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়াও বেশ কিছু জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে মেয়াদ উত্তীর্ণ দুধ, দই এবং সস। প্যাকেটজাত খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা ব্যবহার করা খাদ্য সুরক্ষা বিধির গুরুতর লঙ্ঘন। দুধ ও দইয়ের মতো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাতে ক্ষতিকর জীবাণু জন্মাতে পারে। সেই খাবার রান্নায় ব্যবহার করা হলে বা সরাসরি পরিবেশন করা হলে ক্রেতাদের স্বাস্থ্যের জন্য বিপদ তৈরি হতে পারে।
অভিযানে আরও একটি গুরুতর বিষয় সামনে এসেছে বিরিয়ানিতে কৃত্রিম রং ব্যবহারের অভিযোগ। খাবারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে অনেক সময় রান্নায় অতিরিক্ত রং মেশানো হয়। কিন্তু অনুমোদনহীন কৃত্রিম রং বা রাসায়নিক শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে বলে জানিয়েছেন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকেরা। খাবারে কী ধরনের রং ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি অনুমোদিত কি না এবং নির্ধারিত মাত্রা মানা হচ্ছে কি না—এই বিষয়গুলিও খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের নজরে রয়েছে।
হলদিয়া মহকুমা খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক ইন্দ্রনীল সরকার জানান, অধিকাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁয় বাসি বা পচা খাদ্যসামগ্রী তেল-মশলা মাখিয়ে গরম করে পরিবেশন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অভিযানের সময় সেই অনিয়ম ধরা পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, বিরিয়ানিতে কৃত্রিম রং মেশানো হচ্ছে, যা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। আরও নানা ধরনের অনিয়মের সন্ধান মিলেছে। তবে আপাতত সংশ্লিষ্ট হোটেল মালিকদের সতর্ক করা হয়েছে এবং ত্রুটি সংশোধনের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, হলদিয়ার হোটেলগুলিকে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের রান্নাঘর পরিষ্কার করতে হবে, নষ্ট ও মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী সরিয়ে ফেলতে হবে এবং খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে। পাশাপাশি, খাদ্য তৈরিতে অনুমোদিত উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাত দিন পর ফের পরিদর্শন করা হবে। তখনও যদি একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ে, তা হলে সংশ্লিষ্ট হোটেল মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে দপ্তর।
শুধু হলদিয়া নয়, বুধবার মহিষাদলেও একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছিল। সেখানে একটি হোটেলের ফ্রিজ থেকে পচা মাংস উদ্ধার করেন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকেরা। ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ঠিক রাখা হয়েছিল কি না, কাঁচা মাংস ও রান্না করা খাবার আলাদা করে রাখা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। কাঁচা মাংস দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করে রাখলে তা থেকে দুর্গন্ধ, জীবাণু এবং খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের এমন কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আধিকারিকেরা। তাঁদের বক্তব্য, ব্যবসায়িক লাভের জন্য মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করা কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ক্রেতারা টাকা দিয়ে খাবার কিনছেন। সেই খাবার নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং নির্ধারিত মানের হওয়া আবশ্যিক। রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি, খাবার ঢেকে রাখা এবং ফ্রিজে সঠিক পদ্ধতিতে খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়ম মেনে চলতে হবে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এই অভিযান আরও চলবে। হলদিয়া মহকুমা-সহ গোটা জেলায় আগামী ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের নজরদারি অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে আরও হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং খাবারের দোকানে আকস্মিক পরিদর্শন করা হবে। অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কোনও নির্দিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করা নয়, বরং খাদ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা। তবে সতর্ক করার পরেও নিয়ম না মানলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হলদিয়ার মতো শিল্পাঞ্চল ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতিদিন বহু মানুষ হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খান। কর্মসূত্রে বাইরে থাকা মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটক, শ্রমিক এবং স্থানীয় বাসিন্দা—সবাই এই খাবারের উপর নির্ভর করেন। ফলে পচা মাছ, মেয়াদ উত্তীর্ণ দুগ্ধজাত সামগ্রী কিংবা কৃত্রিম রং মেশানো খাবারের অভিযোগ সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের এই অভিযান নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাই আরও স্পষ্ট করে দিল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments