
নিউজ ডেস্ক: রাজ্যের বিএড কলেজগুলির পরিকাঠামো, পাঠদান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল উচ্চশিক্ষা দফতর। রাজ্য জুড়ে শত শত বিএড কলেজ পরিদর্শনের পর একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে দাবি করেছেন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, পরিদর্শনে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও সামনে এসেছে, যেগুলির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০টি বিএড কলেজকে ইতিমধ্যেই শো-কজ় নোটিস পাঠানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর। বিশেষ করে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বিএড কলেজগুলির পরিস্থিতি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন বলেই তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে। অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে রাজ্যে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ছাড়াই বহু প্রতিষ্ঠান চলেছে। কোথাও নিয়মিত পঠনপাঠন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও আবার ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি এবং শিক্ষার মান নিয়েও দেখা দিয়েছে সন্দেহ।
জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, জুলাই এবং অগস্ট মাসে রাজ্যের মোট ৬০২টি বিএড কলেজ পরিদর্শন করা হয়েছে। সেই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিকাঠামো, শিক্ষাকর্মী, ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি এবং নিয়মিত পঠনপাঠনের পরিস্থিতি যাচাই করা।
মন্ত্রী দাবি করেছেন, তদন্ত ও পরিদর্শনের ফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কয়েকটি ক্ষেত্রে নথিতে যে জায়গায় বিএড কলেজ থাকার উল্লেখ ছিল, সেখানে গিয়ে কার্যত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫৩টি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জায়গায় বিএড কলেজ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে ১৭টি জায়গায় কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।
পরিদর্শনের পরে কলেজগুলির অবস্থা নিয়ে প্রাথমিকভাবে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী। তাঁর দাবি, ২৬৫টি বিএড কলেজ এমন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলিকে কার্যত চলার অনুপযুক্ত বলে মনে করা হয়েছে। অন্য দিকে, প্রায় ১৫১টি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক ভাবে সঠিক নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে একাধিক কলেজের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জগন্নাথের দাবি, প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০টি বিএড কলেজকে শো-কজ় নোটিস দেওয়া হয়েছে। কেন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।
রাজ্যে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৬২ হাজার ছাত্রছাত্রী বিএড পাশ করেন। ফলে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে শিক্ষামহলের একাংশ। কারণ, ভবিষ্যতের শিক্ষক তৈরির দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানগুলির উপর, তাদের শিক্ষার মান এবং পরিকাঠামো দুর্বল হলে তার প্রভাব সরাসরি স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার উপর পড়তে পারে।
মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবসায়িকীকরণ, অনিয়ম এবং অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাঁর কথায়, কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাকে কার্যত ব্যবসায় পরিণত করা হয়েছিল। এমনকি ডিগ্রি প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তবে এই অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। শো-কজ় পাওয়া কলেজগুলির বক্তব্য এবং প্রশাসনিক তদন্তের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বিএড কলেজগুলির পরিদর্শন সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের কথাও জানিয়েছেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। শুধু বর্তমান পরিস্থিতিই নয়, গত প্রায় ১৫ বছরে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও ওই শ্বেতপত্রে তুলে ধরা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
পরবর্তী পর্যায়ে তদন্ত কমিশন বিষয়টি আরও বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কলেজগুলির বিরুদ্ধে আইন ও প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সব মিলিয়ে রাজ্যের শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বড়সড় সংস্কারের ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকারের এই পদক্ষেপ। ৬০২টি কলেজ পরিদর্শনের পর প্রায় পাঁচশো প্রতিষ্ঠানকে শো-কজ়— এই পরিসংখ্যানই বিএড শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
এখন নজর থাকবে, শো-কজ় পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলি কী জবাব দেয় এবং সরকারের ঘোষিত শ্বেতপত্রে ঠিক কী তথ্য সামনে আসে। শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ দিনের অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সত্যিই কি বড়সড় পদক্ষেপ হবে, নাকি তদন্তের পর ছবিটা অন্য রকম হবে— সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী দিনে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments