
নিউজ ডেস্ক; ঝকঝকে আকাশ। চারপাশে পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য। তীর্থযাত্রীদের চোখ তখন আটকে ছিল প্রকৃতির সেই মনোরম দৃশ্যে। বাসের ভিতরেও চলছিল গল্প, হাসি-আড্ডা। কেউ জানতেন না, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই শান্ত পরিবেশ বদলে যাবে ভয়াবহ আতঙ্কে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা নুড়ি-পাথর, কাদা এবং জলরাশির প্রবল স্রোত মুহূর্তে গ্রাস করে নিতে পারে রাস্তা, বাড়িঘর, দোকানপাট—এমন দৃশ্য এতদিন খবরের কাগজ ও টেলিভিশনের পর্দাতেই দেখেছেন হলদিয়ার আজাদ হিন্দ নগরের বাসিন্দা রুবি পাল। কিন্তু নেপালের বিপর্যয়ের দিন সেই ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখেছেন ষাটোর্ধ্ব এই মহিলা।
অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরলেও এখনও সেই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি রুবি। বুধবার নিজের ফ্ল্যাটে বসে ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বার বার কেঁপে উঠছিলেন তিনি। কখনও চোখে জল চলে আসছিল, কখনও থমকে যাচ্ছিল তাঁর কথা। তাঁর সঙ্গে থাকা ২২ জনের তীর্থযাত্রী দলের প্রত্যেকেই নিরাপদে ফিরে এসেছেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে কৈলাস ও মানস সরোবর যাওয়ার উদ্দেশ্যে নেপাল হয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন রুবি এবং তাঁর সহযাত্রীরা। প্রথমে তাঁরা পৌঁছন কাঠমান্ডুতে। সেখান থেকে উত্তরের পাহাড়ি পথে এগোচ্ছিল তাঁদের বাস। রুবি জানান, কাঠমান্ডু থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পথ এগোনোর পরে একটি জায়গায় চা খাওয়ার জন্য বাস থামানো হয়েছিল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফের যাত্রা শুরু হয়।
এর পরেই বদলে যায় পরিস্থিতি। রুবির কথায়, বাস কিছুটা এগোতেই দূরে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পান তাঁরা। প্রথমে মনে হয়েছিল, যেন পাহাড়ের গা থেকে সাদা মেঘ উড়ে আসছে। কিন্তু বাস যত এগোতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয় সেই দৃশ্যের ভয়াবহতা। দূর থেকে ভেসে আসছিল প্রবল গর্জনের মতো শব্দ। তার সঙ্গে মিশে ছিল মানুষের চিৎকার, কান্না এবং আতঙ্কে ‘ভাগো, ভাগো’ বলে চেঁচানোর আওয়াজ।
রুবি বলেন, মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার দু’পাশে থাকা মানুষজন ছোটাছুটি শুরু করে দেন। স্কুলের ছাত্রছাত্রী, দোকানদার, পথচলতি মানুষ—কেউই বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী ভাবে নিজেদের বাঁচাবেন। পাহাড়ের দিক থেকে নেমে আসা জল, কাদা ও পাথরের স্রোত ক্রমশ এগিয়ে আসছিল। বাসের ভিতরেও তখন হুলুস্থুল কাণ্ড। যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করতে শুরু করেন। কেউ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলেন, কেউ আবার চালককে দ্রুত গাড়ি ঘোরানোর অনুরোধ করছিলেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে দেরি করেননি বাসচালক। রুবির বক্তব্য অনুযায়ী, চালক সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি রাস্তায় বিপজ্জনক ভাবে বাস ঘুরিয়ে দেন। রাস্তা তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। সেই সুযোগেই দ্রুত গাড়ি চালিয়ে কাঠমান্ডুর দিকে ফিরে আসেন তিনি। বাসের ভিতরে তখন যাত্রীদের একটাই প্রার্থনা—যে কোনও ভাবে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছনো।
হোটেলে ফিরে টেলিভিশনে বিপর্যয়ের ছবি দেখেন রুবি। তখনই বুঝতে পারেন, কত বড় বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলেন তাঁরা। টেলিভিশনের পর্দায় পাহাড়ি স্রোতের তাণ্ডব, ভেসে যাওয়া রাস্তা এবং বিপর্যস্ত এলাকার ছবি দেখে আতঙ্কে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ফিরে এসেছিল বেঁচে থাকার স্বস্তিও। রুবির কথায়, সেদিন বাসটি যদি আর কিছুটা এগিয়ে যেত, তা হলে তাঁদের কী পরিণতি হত, ভাবতেই শিউরে উঠছেন তিনি।
এই যাত্রায় বার বার দেরি হওয়াই শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রুবি। ভিসা পেতে তাঁদের দু’দিন অতিরিক্ত সময় লেগেছিল। তার উপর পাহাড়ি পথে নানা সমস্যা, রাস্তার পরিস্থিতি এবং নিজেদের প্রয়োজনেও একাধিক বার বাস থামাতে হয়েছিল। সেই কারণে তাঁদের যাত্রা নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ধীরগতিতে এগিয়েছিল। রুবির মতে, সেই বিলম্বই হয়তো তাঁদের বিপদের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছনো থেকে আটকে দিয়েছে।
বাসচালকের ভূমিকার কথাও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। রুবি বলেন, সেদিন চালকই তাঁদের কাছে ত্রাতার মতো হয়ে উঠেছিলেন। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে উপস্থিত বুদ্ধি না হারিয়ে দ্রুত বাস ঘুরিয়ে না নিলে ২২ জনের কারও বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা থাকত না বলেই মনে করছেন তিনি। চালককে ধন্যবাদ জানানোর মতো ভাষা তাঁর জানা নেই বলেও জানিয়েছেন রুবি।
নেপাল সফরের শুরুতে পশুপতিনাথ মন্দির এবং জলনারায়ণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলেন রুবিরা। পাহাড়, মন্দির, নদী এবং প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য তাঁদের যাত্রাকে স্মরণীয় করে তুলেছিল। কিন্তু সেই আনন্দের স্মৃতিকে ছাপিয়ে এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের ছবিই বার বার ফিরে আসছে তাঁর মনে।
রুবি জানিয়েছেন, শারীরিক ভাবে নিরাপদে বাড়ি ফিরলেও মানসিক ভাবে এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি তিনি। হঠাৎ জোরে কোনও শব্দ শুনলে চমকে উঠছেন। পাহাড়ি রাস্তা বা প্রবল জলের ছবি দেখলেও সেই দিনের কথা মনে পড়ছে। সহযাত্রীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তিনি। সকলেই বেঁচে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই দিনের আতঙ্ক তাঁদের কথাবার্তায় এখনও স্পষ্ট।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যে কোনও মুহূর্তে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে—নেপালের এই অভিজ্ঞতা রুবির কাছে সেই কঠিন সত্যই সামনে এনেছে। তাঁর মতে, পাহাড়ি পথে যাত্রার সময় আবহাওয়া, রাস্তার পরিস্থিতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চালকের গুরুত্বও এই ঘটনার পরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments