
নিউজ ডেস্ক: নিউ আলিপুরে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত দুই বেসরকারি সংস্থায় তল্লাশি অভিযান চালাল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বিরোধী তদন্ত কমিশন। বৃহস্পতিবার দুপুরে নিউ আলিপুরের টালিগঞ্জ সার্কুলার রোড এলাকার ‘হাকিম পলিমেকার’ এবং ‘হাকিম কেমিক্যালস’ নামে দুই সংস্থার দফতরে যান তদন্ত কমিশনের সদস্যেরা। তাঁদের সঙ্গে ছিল নিউ আলিপুর থানার পুলিশও।
তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সম্পত্তি বা আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনও অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। কমিশন সূত্রে অভিযোগ, দুর্নীতির মাধ্যমে কোনও সম্পত্তি কেনা হয়েছিল কি না অথবা এর নেপথ্যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির যোগ রয়েছে কি না, সেই সমস্ত সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে তদন্তাধীন অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
তল্লাশি অভিযানকে ঘিরে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই নিউ আলিপুর এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। তদন্ত কমিশনের সদস্যেরা পুলিশি উপস্থিতিতে দুই সংস্থার দফতরে পৌঁছে নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখেন বলে জানা গিয়েছে। আর্থিক লেনদেন, সংস্থার সম্পত্তি এবং মালিকানা সংক্রান্ত নথিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংস্থার ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘হাকিম পলিমেকার প্রাইভেট লিমিটেড’ প্লাস্টিকজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থা। সংস্থাটির তরফে গ্রাহকদের সুলভ মূল্যে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে, ‘হাকিম কেমিক্যালস’ রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানা যাচ্ছে।
ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই সংস্থার সঙ্গে ফিরহাদ হাকিমের নাম যুক্ত রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ‘ববি’ নামে পরিচিত। তবে তদন্ত কমিশনের তল্লাশি মানেই কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে— এমন নয়। তদন্তের পর সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পরীক্ষা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবারের অভিযানের সময় ফিরহাদ হাকিম বা তাঁর পরিবারের কোনও সদস্য সংশ্লিষ্ট দফতরে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গিয়েছে। তদন্ত কমিশনের সদস্যেরা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না কিংবা কোনও নথি সংগ্রহ করেছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নতুন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই কমিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। বিভিন্ন সরকারি, আধা-সরকারি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে কোনও অনিয়ম বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করাই কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব।
এই প্রেক্ষাপটেই ফিরহাদের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত বেসরকারি সংস্থাগুলিতে কমিশনের তল্লাশি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কারণ, দীর্ঘদিন রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ফিরহাদ। কলকাতা পুরসভা এবং রাজ্য রাজনীতি— দুই ক্ষেত্রেই তাঁর পরিচিতি যথেষ্ট।
তদন্ত কমিশনের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সম্পত্তি কী ভাবে অর্জিত হয়েছিল? অর্থের উৎস কী ছিল? ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার যোগ ছিল কি না? কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না— তদন্তে এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হতে পারে।
তবে তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও সব তথ্য প্রকাশ্যে আনেনি। কমিশনের হাতে থাকা নথিপত্র বা প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঠিক কী তথ্য উঠে এসেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে এই পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগকে তদন্তাধীন অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তল্লাশি অভিযান রাজনৈতিক মহলেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিরোধীদের একাংশ বিষয়টির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলতে পারে। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তদন্ত কমিশনের তল্লাশি এবং অভিযোগের বিষয়ে ফিরহাদ হাকিম বা তাঁর প্রতিনিধিদের বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে ছবিটি আরও স্পষ্ট হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতা বন্দর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে ফের নির্বাচিত হয়েছেন ফিরহাদ। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে তিনি কলকাতার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
সব মিলিয়ে নিউ আলিপুরের এই তল্লাশি অভিযান এখন তদন্ত কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর বাড়িয়েছে। কমিশন কী ধরনের নথি পরীক্ষা করছে, কোনও আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মেলে কি না এবং তদন্ত শেষে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছন তদন্তকারীরা— সেই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন— তদন্তে কোনও অভিযোগ ওঠা বা কোনও প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments