
নিউজ ডেস্ক; প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই ফের মাটির বাড়ি ভেঙে মৃত্যুর ঘটনা। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এ বার বাঁকুড়ার সিমলাপালে মাটির বাড়ির দেওয়াল ধসে মৃত্যু হল এক দম্পতির। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেছে সিমলাপাল ব্লকের কুশতোড়া গ্রামের কুশতোড়া আদিবাসী পাড়ায়। মৃতদের নাম পালকু বাস্কে (৩৬) এবং সোমা বাস্কে (২৫)। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সময় দু’জনেই বাড়ির ভিতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রবল বৃষ্টির জেরে আচমকা মাটির বাড়ির একটি অংশ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। তার নীচেই চাপা পড়েন তাঁরা।
ঘটনার পর রাতের অন্ধকারেই এলাকায় হইচই পড়ে যায়। দেওয়াল ভেঙে পড়ার বিকট শব্দ শুনে আশপাশের বাড়ির বাসিন্দারা ছুটে আসেন। স্থানীয়রাই দ্রুত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দম্পতিকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরে খবর দেওয়া হয় সিমলাপাল থানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দু’জনকে উদ্ধার করে সিমলাপাল ব্লক প্রাথমিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দু’জনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দিন ধরে এলাকায় বৃষ্টি চলছিল। মঙ্গলবার রাতেও বৃষ্টির তীব্রতা ছিল যথেষ্ট। তার মধ্যেই মাটির বাড়িটির দেওয়ালের একটি অংশ আচমকা দুর্বল হয়ে পড়ে। ঘুমন্ত অবস্থায় থাকায় বিপদ বুঝে ওঠার সুযোগ পাননি পালকু ও সোমা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁদের উপর ভেঙে পড়ে দেওয়াল।
কুশতোড়া গ্রামের আদিবাসী পাড়ায় এই ঘটনায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, অন্যান্য দিনের মতোই মঙ্গলবার রাতে নিজেদের বাড়িতে ছিলেন ওই দম্পতি। রাতে বৃষ্টি বাড়ার পরও যে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে, তা কেউ আঁচ করতে পারেননি। আচমকা দেওয়াল ভেঙে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আশপাশের বাসিন্দাদের। এরপর তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন পুলিশকর্মীরা। গুরুতর অবস্থায় দু’জনকে সিমলাপাল ব্লক প্রাথমিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে। কী ভাবে বাড়িটির দেওয়াল ভেঙে পড়ল, বাড়িটির অবস্থা আগে থেকেই কতটা খারাপ ছিল এবং প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে এই দুর্ঘটনার সম্পর্ক কতটা—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দু’জনের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাতের এই দুর্ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বর্ষায় মাটির বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে। পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এখনও বহু পরিবার মাটির দেওয়ালের বাড়িতে বসবাস করেন। দীর্ঘদিনের বৃষ্টি কিংবা একটানা ভারী বর্ষণে সেই সব বাড়ির দেওয়াল নরম হয়ে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে বাড়ির ছাদ বা দেওয়ালে অতিরিক্ত জল ঢুকে গেলে ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। রাতে ঘুমের সময়ে এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে বিপদ আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সিমলাপালের কুশতোড়ার ঘটনাতেও ঠিক কী কারণে দেওয়ালটি ভেঙে পড়ল, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, বর্ষার সময় মাটির বাড়িগুলির অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোথাও দেওয়ালে ফাটল দেখা দিলে কিংবা বাড়ির মাটি নরম হয়ে গেলে দ্রুত বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া দরকার। শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ নয়, বর্ষার আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িগুলিকে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করা উচিত বলেও দাবি উঠেছে।
এই দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক দিন আগের পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘটনাটিও সামনে আসছে। গত রবিবার গভীর রাতে ঝালদা এলাকায় একটি ভগ্নপ্রায় মাটির বাড়ি আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। সেই ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছিল এক বৃদ্ধ এবং তাঁর ৪৯ বছরের অবিবাহিত মেয়ে দুর্গা প্রধানের। পরিবারের আরও কয়েক জন সদস্য আহত হন। তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা করা হয়।
পরপর দুই জেলায় মাটির বাড়ি ভেঙে মৃত্যুর ঘটনায় বর্ষাকালে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িগুলির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বহু মানুষ এখনও পুরনো মাটির বাড়িতে বসবাস করেন। আর্থিক কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে দ্রুত পাকা বাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয় না। ফলে বছরের পর বছর একই বাড়িতে থাকতে হয় তাঁদের। বর্ষার সময় সেই বাড়ির দেওয়াল দুর্বল হয়ে পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে তা সংস্কারের সুযোগ থাকে না।
স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, প্রশাসনের তরফে বর্ষার আগে ঝুঁকিপূর্ণ মাটির বাড়ির তালিকা তৈরি করা হলে এই ধরনের দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব। কোনও বাড়ি বসবাসের জন্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলিকে বাড়ি মেরামতি বা পাকা বাড়ি তৈরির সরকারি প্রকল্পের আওতায় দ্রুত আনার দাবিও উঠছে।
কুশতোড়ার ঘটনায় পালকু ও সোমার মৃত্যুতে তাঁদের পরিচিত ও প্রতিবেশীদের মধ্যে গভীর শোক তৈরি হয়েছে। যে বাড়িতে দিনের পর দিন সংসার চলেছে, সেখানেই রাতের অন্ধকারে এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেউ ভাবতে পারেননি। বৃষ্টির রাতে আচমকা দেওয়াল ধসে পড়ার ঘটনায় কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল একটি পরিবারের দুই সদস্যের জীবন।
এখন পুলিশের তদন্তে উঠে আসবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ। বাড়িটির কাঠামোগত দুর্বলতা, টানা বৃষ্টির প্রভাব এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ময়নাতদন্তের রিপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে তদন্তের ফল যাই হোক, এই ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল—বর্ষার সময় পুরনো মাটির বাড়ি কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
সিমলাপালের কুশতোড়া গ্রামের এই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু একটি দুর্ঘটনার তদন্ত করলেই হবে না। এলাকায় এমন আরও কোনও ঝুঁকিপূর্ণ মাটির বাড়ি রয়েছে কি না, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে আবহাওয়া দফতরের তরফে যখন ভারী বৃষ্টির সতর্কতা থাকে, তখন ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে।
বর্ষা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে আগামী দিনে আরও বৃষ্টি হলে পুরনো ও দুর্বল বাড়িগুলির ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়ানো জরুরি। কুশতোড়ার মর্মান্তিক ঘটনা যেন আরও বড় বিপদের পূর্বাভাস না হয়ে ওঠে, সেই আশঙ্কাই এখন স্থানীয়দের মনে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments