Homeঅন্যান্যলাইফস্টাইলগরম ভাতে এক চামচ ঘি, শুধু স্বাদের জন্য নয়! রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কতটা উপকারী এই বাঙালি অভ্যাস?

গরম ভাতে এক চামচ ঘি, শুধু স্বাদের জন্য নয়! রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কতটা উপকারী এই বাঙালি অভ্যাস?

নিউজ ডেস্ক : গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, তার উপর এক চামচ ঘি, সঙ্গে সামান্য নুন আর কাঁচা লঙ্কা—বাঙালির কাছে এই
JERSEY-COW-GHEE-580×560

নিউজ ডেস্ক : গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, তার উপর এক চামচ ঘি, সঙ্গে সামান্য নুন আর কাঁচা লঙ্কা—বাঙালির কাছে এই খাবারের সুখের সঙ্গে যেন আলাদা করে কোনও তরকারির প্রয়োজনই পড়ে না। ছোটবেলা থেকে বহু বাঙালির দুপুরের পাতে এমন দৃশ্য পরিচিত। তবে শুধু স্বাদ কিংবা গন্ধের জন্যই যে ভাতের সঙ্গে ঘি খাওয়ার এই অভ্যাস জনপ্রিয়, তা নয়। পুষ্টিবিজ্ঞানেও খাবারের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের ফ্যাট থাকার কিছু সম্ভাব্য উপকারিতার কথা উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ভাতের মতো কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ফ্যাট যোগ করলে শরীরে কার্বোহাইড্রেট হজম ও শর্করা শোষণের গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। সেই কারণেই ভাতের সঙ্গে ঘি খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রেও আলোচনা হয়। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ঘি কোনও ভাবেই ডায়াবিটিসের ওষুধের বিকল্প নয়। কতটা ঘি খাবেন, তা ব্যক্তির বয়স, ওজন, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।

ঘি কি ভাতের শর্করা শোষণের গতি কমাতে পারে?

সাদা ভাতে মূলত কার্বোহাইড্রেট থাকে। ভাত খাওয়ার পর সেটি হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে। খাবারের সঙ্গে ফ্যাট থাকলে হজমের প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হতে পারে। ফলে একই পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছু ক্ষেত্রে কম হতে পারে।

এই কারণেই ভাতের সঙ্গে ঘি খাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাইপ-২ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত ১০৩ জনকে নিয়ে তিন মাসের একটি গবেষণায় সাদা ভাতের সঙ্গে ঘি খাওয়ার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের গবেষণার শুরুতে HbA1c বা দীর্ঘমেয়াদি রক্তে শর্করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক পরীক্ষা করা হয়। তিন মাস পর তাঁদের মধ্যে ৮৬.৪১ শতাংশের HbA1c কমে যাওয়ার কথা ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে ১৩.৫৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রে সূচকটি বেড়েছিল।

তবে এই ধরনের একটি গবেষণার ফল দেখেই সবার ক্ষেত্রে একই ফল হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। গবেষণার পদ্ধতি, অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ডায়াবিটিস থাকলে শুধুমাত্র ঘি মিশিয়ে ভাত খাওয়াকেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

ঘিতে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিডের ভূমিকা

ঘিতে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। তার মধ্যে বুটিরিক অ্যাসিড নিয়ে বিশেষ ভাবে আলোচনা করা হয়। অন্ত্রে থাকা কিছু অণুজীব বুটিরেট তৈরি করে, যা বৃহদন্ত্রের কোষগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।

ফ্যাট শরীরের একাধিক স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত। তবে ‘ঘি খেলেই হৃদ্‌যন্ত্র ভাল থাকবে’ বা ‘ঘি খেলেই ত্বকের সমস্যা দূর হবে’—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং ঘি একটি স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উৎস হওয়ায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে যাঁদের কোলেস্টেরল বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খাদ্যপরামর্শ মেনে চলাই নিরাপদ।

ভিটামিন শরীরে কাজে লাগাতেও ফ্যাট দরকার

খাবারের সঙ্গে ফ্যাট থাকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। শরীরের প্রয়োজনীয় কিছু ভিটামিন ফ্যাটে দ্রবণীয়। ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ খাবারের সঙ্গে সামান্য স্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকলে এই ভিটামিনগুলির শোষণে সহায়তা হতে পারে।

ধরা যাক, ভাতের সঙ্গে পালংশাক, গাজর, কুমড়ো বা অন্য কোনও সবজি খাওয়া হচ্ছে। ওই খাবারগুলিতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাবারের অংশ হিসেবে উপযুক্ত পরিমাণ ফ্যাট থাকলে ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিন শরীরের ব্যবহারের জন্য আরও সহজলভ্য হতে পারে।

তবে সেই ফ্যাটের উৎস হিসেবে শুধুমাত্র ঘির উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বাদাম, বীজ, মাছ, বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেল-সহ নানা খাবার থেকেও প্রয়োজনীয় ফ্যাট পাওয়া যায়। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য রাখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ঘির গন্ধে বাড়ে খাওয়ার তৃপ্তি

গরম ভাতের উপর ঘি পড়তেই যে সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, সেটিই অনেকের কাছে খাবারটির অন্যতম আকর্ষণ। ঘির নিজস্ব সুগন্ধ খাবারের স্বাদ ও খাওয়ার অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে অল্প খাবারেও তৃপ্তি পাওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু পুষ্টিই নয়, স্বাদ, গন্ধ এবং তৃপ্তিও গুরুত্বপূর্ণ। মন দিয়ে খাওয়া এবং খাবারের স্বাদ উপভোগ করা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কিছু ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। তবে এই বিষয়টি ব্যক্তিভেদে আলাদা এবং ঘির গন্ধ নিজে থেকে ওজন কমানো বা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের কোনও প্রমাণিত পদ্ধতি নয়।

আয়ুর্বেদে বহু পুরনো ঘির ব্যবহার

ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও খাদ্যসংস্কৃতিতে ঘির ব্যবহার বহু পুরনো। আয়ুর্বেদে ঘিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। স্মৃতিশক্তি, চোখ, ফুসফুস-সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য ঘির উপকারিতার কথাও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা সাহিত্যে পাওয়া যায়।

তবে ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় কোনও খাবারের ব্যবহার রয়েছে বলেই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তার সব দাবিই প্রমাণিত—এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। কোনও নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় ঘির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

তাহলে গরম ভাতে ঘি খাবেন?

উত্তরটা হল—পরিমাণ বুঝে খেলে অনেকের সুষম খাদ্যতালিকায় ঘি থাকতে পারে। কিন্তু ‘ঘি স্বাস্থ্যকর’ বলেই যত খুশি খাওয়া ঠিক নয়। ঘিতে ক্যালোরি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে। তাই একসঙ্গে বেশি পরিমাণ ঘি খেলে মোট ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রক্তের লিপিড প্রোফাইলের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে ডায়াবিটিস থাকলে শুধু ভাতের সঙ্গে ঘি যোগ করলেই খাবারটি স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। ভাতের পরিমাণ, সঙ্গে থাকা সবজি, ডাল বা প্রোটিনের উৎস, দৈনিক শারীরিক পরিশ্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ—সবকিছুর সমন্বয়েই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অর্থাৎ বাঙালির গরম ভাতে ঘি খাওয়ার পুরনো অভ্যাস একেবারে অস্বাস্থ্যকর—এমনও নয়। আবার ঘিকে ‘সুপারফুড’ ভেবে অতিরিক্ত খাওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পরিমাণে সংযম রেখে, সুষম খাবারের অংশ হিসেবে ঘি খাওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved