
নিউজ ডেস্ক : এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ২২ বছরের তরুণী নিধি প্যাটেল হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। গুজরাতের সুরাত জেলার গোদাবড়ি গ্রামের এই ঘটনায় একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। নিধিকে কি শুধুই ডাকাতির উদ্দেশ্যে খুন করা হয়েছিল, নাকি তাঁকেই লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল? তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য।
গত ২৪ অগস্ট সকালে নিজের বাড়ির ছাদ থেকে নিধি প্যাটেলের দেহ উদ্ধার হয়। পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ওই তরুণী ঘটনার সময় বাড়িতে একাই ছিলেন। তাঁর বাবা-মা তখন তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। ফিরে এসে মেয়েকে ওই অবস্থায় দেখে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন তাঁরা। পরিবারের দাবি, যত দিন না মেয়ের হত্যাকারী গ্রেফতার হচ্ছে, তত দিন নিধির শেষকৃত্য করা হবে না।
ঘটনার পর থেকেই তদন্তে নেমেছে সুরাত পুলিশ। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করছিল মান্ডভি থানার পুলিশ। কিন্তু বেশ কয়েক দিন কেটে গেলেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় সুরাতের পুলিশ সুপার রাজেশ গাড়িয়া বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করেন। সেই দলের নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে মান্ডভি ডিভিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার অক্ষেশ ইঞ্জিনিয়ারকে। প্রায় ৬০ জন পুলিশকর্মীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে তদন্তকারী দল।
তবে SIT তদন্তভার নেওয়ার পরও এখনও পর্যন্ত খুনিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল, কী ভাবে আততায়ী নিধির বাড়িতে ঢুকেছিল। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বাড়ির দরজা বা অন্য কোনও জায়গায় জোর করে প্রবেশের স্পষ্ট চিহ্ন মেলেনি। ফলে তদন্তকারীদের একাংশের অনুমান, অপরাধী হয়তো নিধির পরিচিত কেউ হতে পারেন।
ঘটনার সময় বাড়িতে একাই ছিলেন নিধি। তাঁর বাবা-মা বাইরে থাকায় সেই সুযোগ নিয়েই কেউ বাড়িতে ঢুকেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি সত্যিই পরিচিত কেউ হয়ে থাকেন, তা হলে নিধি নিজেই তাঁকে বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় এসেছে।
অন্য দিকে, বাড়ির দরজার অবস্থানও তদন্তকারীদের ভাবাচ্ছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়ির পিছনের দরজা ঘটনার পর খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। অথচ সামনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। ফলে খুনি কোন পথে বাড়িতে ঢুকেছিল এবং কী ভাবে বেরিয়ে যায়, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, শ্বাসরোধ করে নিধিকে হত্যা করা হয়েছিল বলে সন্দেহ। তাঁর গলায় শর্টসের দড়ি এবং মোবাইল ফোনের চার্জারের তার ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি তাঁর মুখ প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে আটকে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার ধরন দেখে তদন্তকারীরা মনে করছেন, নিধিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একাধিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের সঠিক উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
নিধির শরীরে, বিশেষ করে গোপনাঙ্গের কাছে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে। সেই কারণে যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক তদন্তের সম্পূর্ণ ফল হাতে না আসা পর্যন্ত নিধিকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ।
প্রথম থেকেই তদন্তে আর একটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে—ঘটনার পিছনে কি ডাকাতির উদ্দেশ্য ছিল? বাড়িতে চুরি করতে এসে নিধির সঙ্গে কোনও ভাবে ধস্তাধস্তি এবং তার পর তাঁকে খুন করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
কিন্তু বাড়িতে জোর করে ঢোকার স্পষ্ট চিহ্ন না পাওয়া যাওয়ায় সেই তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদি সত্যিই ডাকাতিই মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তা হলে অপরাধী কী ভাবে বাড়িতে ঢুকল, কী কী জিনিস নিয়ে গেল এবং হত্যার পরে কোন পথে পালাল—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
অন্য দিকে, নিধিকে লক্ষ্য করেই যদি কেউ বাড়িতে ঢুকে থাকে, তা হলে তাঁর সঙ্গে অভিযুক্তের পূর্বপরিচয় কী ছিল, সেই বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অভিযুক্তের সন্ধান পেতে নিধির ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর সাম্প্রতিক ফোন কল, মেসেজ এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা। ঘটনার আগে কার সঙ্গে নিধির যোগাযোগ হয়েছিল, শেষ বার কাকে ফোন করেছিলেন, কার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন—এসব তথ্য থেকে সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
পাশাপাশি আঙুলের ছাপ এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া অন্যান্য ফরেন্সিক প্রমাণও পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাড়িতে পরিচিত বা অপরিচিত কারও উপস্থিতির কোনও চিহ্ন পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
মেয়েকে হারিয়ে নিধির পরিবার এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, ঘটনার সময় তাঁরা বাড়িতে ছিলেন না। তীর্থযাত্রা থেকে ফিরে এসে মেয়ের দেহ উদ্ধারের ঘটনা পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
অভিযুক্ত এখনও অধরা থাকায় পরিবারের উদ্বেগও বাড়ছে। তাঁদের দাবি, হত্যাকারী গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত নিধির শেষকৃত্য করা হবে না। অর্থাৎ, পরিবারের কাছে এই মুহূর্তে একমাত্র দাবি—মেয়ের হত্যার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন হোক এবং অপরাধীকে গ্রেফতার করা হোক।
প্রায় ৬০ জন পুলিশকর্মীকে নিয়ে SIT তদন্ত চালাচ্ছে। বিভিন্ন সম্ভাব্য সূত্র যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত তদন্তকারীদের হাতে এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য আসেনি, যার ভিত্তিতে প্রকাশ্যে অভিযুক্তের পরিচয় জানানো যায়। নিধিকে কেন খুন করা হল, খুনের আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং ঘটনাটির পিছনে ডাকাতি, ব্যক্তিগত শত্রুতা নাকি অন্য কোনও কারণ ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন খুঁজছে সুরাত পুলিশ।
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রহস্যের জট কাটেনি। ফলে নিধি প্যাটেল হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন নজর রয়েছে ফরেন্সিক রিপোর্ট, ফোনের তথ্য এবং নিধির শেষ দিকের যোগাযোগের উপর। সেখান থেকেই মিলতে পারে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments