
নিউজ ডেস্ক : বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোর আর বেশি দেরি নেই। হাতে গোনা কয়েক সপ্তাহ পরেই ঢাকে কাঠি পড়বে। কিন্তু উৎসবের আবহ তৈরি হওয়ার আগেই মাথায় হাত পূর্ব মেদিনীপুরের পদ্মচাষি ও ব্যবসায়ীদের। টানা বৃষ্টি এবং বন্যার জেরে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পদ্মচাষ। ফলে এ বার দুর্গাপুজোর মরসুমে পদ্মফুলের জোগান নিয়ে তৈরি হয়েছে আশঙ্কা। শুধু রাজ্যের বাজার নয়, বিদেশের দুর্গাপুজোগুলিতেও প্রতি বছর পূর্ব মেদিনীপুর থেকে বিপুল পরিমাণ পদ্ম পাঠানো হয়। সেই সরবরাহ ব্যবস্থাতেই এ বার ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে পদ্মফুলের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে সন্ধিপুজোয় দেবী দুর্গার চরণে ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের রীতি রয়েছে। ফলে পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই পদ্মের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। অন্যান্য ফুলের মতো সারা বছর সহজে পাওয়া যায় না বলে পদ্মফুল নিয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ বার সেই প্রস্তুতিতেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতি।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কোলাঘাট-সহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পদ্ম চাষ হয়ে আসছে। জেলার উৎপাদিত পদ্মের বড় অংশ যায় কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে। এর পাশাপাশি জেলার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বাইরেও দুর্গাপুজোর জন্য পদ্মফুল পাঠানো হয়। পুজোর মরসুম যত এগিয়ে আসে, ততই বাড়ে সেই ফুল সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পাঠানোর ব্যস্ততা।
সাধারণত পুজোর বেশ কিছুটা আগে থেকেই চাষিদের কাছ থেকে পদ্মের জন্য আগাম বায়না করে রাখেন ব্যবসায়ীরা। পরে নির্দিষ্ট সময়ে ফুল সংগ্রহ করে তা বাজারে পাঠানো হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ফুল হিমঘরে সংরক্ষণের কাজও শুরু করেন অনেকে। কিন্তু চলতি মরসুমে অতিবৃষ্টি সেই পরিকল্পনাতেও কার্যত জল ঢেলে দিয়েছে।
জেলার বহু পদ্মখেত ইতিমধ্যেই জলমগ্ন হয়েছে। কোথাও দীর্ঘদিন জমিতে জল দাঁড়িয়ে থাকায় গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও আবার ফুল ফোটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই ব্যাহত হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে যে ফুল ফুটেছে, তারও গুণমান নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি। ফলে বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজন অনুযায়ী ফুল জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পদ্মের বাজারদরে। বর্তমানে একটি পদ্মের দাম আগের তুলনায় বেশ চড়া। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পুজোর সময় চাহিদা আরও বাড়লে দাম আরও উপরে উঠতে পারে। পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরো বাজারেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন পুজো উদ্যোক্তাদের বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হতে পারে, অন্য দিকে সাধারণ মানুষকেও ফুল কিনতে বেশি টাকা গুনতে হতে পারে।
তবে শুধু দাম বাড়াই নয়, এ বার মূল চিন্তা ফুল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েই। কারণ পুজোর সময় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পদ্মের প্রয়োজন হয়। পদ্ম ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই দুর্গাপুজোর মরসুমে এক কোটিরও বেশি পদ্মফুলের প্রয়োজন হতে পারে। সেই বিপুল চাহিদার বড় অংশ মেটাতে পূর্ব মেদিনীপুরের মতো পদ্ম উৎপাদনকারী জেলাগুলির উপর নির্ভর করে বাজার।
সন্ধিপুজোর ১০৮ পদ্মের প্রয়োজনীয়তাই চাষি, ব্যবসায়ী এবং পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে এ বার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সাধারণ সময়ে পুজোর আগেই প্রয়োজনীয় ফুলের জন্য চাষিদের সঙ্গে আগাম কথা বলে রাখেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ বার অনিশ্চিত উৎপাদনের কারণে সেই আগাম বায়না নিতেও অনেক চাষি পিছিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা নিজেরাই নিশ্চিত নন, পুজোর সময় খেত থেকে কতটা ফুল পাওয়া যাবে।
কোলাঘাটের পদ্মচাষি ও বিক্রেতা মোহন মাইতির কথাতেও সেই উদ্বেগের ছবি স্পষ্ট। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে বাজারে পদ্মের দাম ভাল থাকলেও পুজোর সময় তা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দাম বাড়লেও যদি খেতে ফুল না থাকে, তা হলে ব্যবসায়ীদের পক্ষেও চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া সম্ভব হবে না। তাঁর মতে, টানা বৃষ্টিতে বহু জায়গায় পদ্মচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক খেতেই ফুল ঠিকমতো ফুটছে না। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দুর্গাপুজোর সময় পদ্মের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বার দুর্গাপুজোও তুলনামূলক দেরিতে হওয়ায় সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুজোর সময় পর্যন্ত খেতে পর্যাপ্ত ফুল থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সাধারণত চাহিদার কথা মাথায় রেখে আগে থেকে পদ্ম তুলে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। কিন্তু লাগাতার বৃষ্টির কারণে সেই সংরক্ষণ প্রক্রিয়াও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত ভাল মানের ফুল না পাওয়া গেলে হিমঘরে রাখার মতো ফুলও কমে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প জোগানের জন্য এখন পূর্ব মেদিনীপুরের ব্যবসায়ীদের ভরসা করতে হচ্ছে পড়শি রাজ্য ওড়িশার উপর। জেলার স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব না হলে ওড়িশা থেকে পদ্ম এনে বাজারের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা হতে পারে। তবে তাতে পরিবহণ খরচ বাড়বে। তার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত ফুলের বাজারদরে পড়তে পারে।
পূর্ব মেদিনীপুরের পদ্মচাষ শুধু স্থানীয় বাজারের সঙ্গে যুক্ত নয়। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশের দুর্গাপুজোগুলিতেও এই জেলার পদ্ম পৌঁছয়। ফলে এ বার উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব জেলার বাইরে আরও বিস্তৃত বাজারেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আগে পূর্ব মেদিনীপুরে পদ্মফুলের চাষ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এক দিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত খেত, অন্য দিকে বাড়তে থাকা বাজারদর এবং অনিশ্চিত জোগান—তিনটি সমস্যাই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত কতটা সহায় হয়, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করছে পুজোর মরসুমে পদ্মের বাজারের ছবি। আপাতত স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি ওড়িশা থেকে ফুল এনে চাহিদা মেটানোর পথেই তাকিয়ে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments