Homeবাঁকুড়ামুকুটমণিপুরভাজা মাছ-ডিমে ছত্রাক, নিষিদ্ধ রং থেকে মেয়াদ-ফুরোনো সামগ্রী! খাতড়া-মুকুটমণিপুরে প্রশাসনের হানায় চাঞ্চল্য

ভাজা মাছ-ডিমে ছত্রাক, নিষিদ্ধ রং থেকে মেয়াদ-ফুরোনো সামগ্রী! খাতড়া-মুকুটমণিপুরে প্রশাসনের হানায় চাঞ্চল্য

resizeplus_Screenshot 2026-09-02 143958_edited

নিউজ ডেস্ক; কোথাও রেফ্রিজারেটরে রাখা মাংসের উৎসের কোনও নথি নেই। কোথাও আবার ভাজা মাছ ও ডিমের গায়ে ছত্রাক। কোনও রেস্তোরাঁর রান্নায় ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ রাসায়নিক রং ও কৃত্রিম সুগন্ধি। আবার কোনও হোটেলের রান্নাঘরে মিলেছে এমন উপকরণ, যার প্যাকেটে মেয়াদ শেষের তারিখ বা ব্যাচ নম্বরেরই উল্লেখ নেই। পর্যটন মরসুমে খাবারের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে এমন একের পর এক অনিয়মের ছবি ধরা পড়ল বাঁকুড়ার খাতড়া এবং মুকুটমণিপুরে। সোমবার রাতের আচমকা প্রশাসনিক অভিযানে বেশ কয়েকটি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ সামনে আসতেই শুরু হয়েছে তৎপরতা।

খাতড়া মহকুমা সদর এবং জেলার অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র মুকুটমণিপুরে খাবারের মান ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অভিযানে নামে জেলা প্রশাসনের একটি বিশেষ দল। সোমবার রাতে খাতড়া বাজারের প্রায় ১৫টি মিষ্টির দোকান ও রেস্তোরাঁয় হানা দেওয়া হয়। একই সময়ে মুকুটমণিপুরের একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁও পরিদর্শন করেন প্রশাসনের আধিকারিকেরা। অভিযানে ছিলেন বাঁকুড়ার অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) চিরন্তন প্রামাণিক, খাতড়ার মহকুমাশাসক তাপস ভট্টাচার্য, মহকুমা পুলিশ আধিকারিক আখতার আলি এবং জেলা খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকেরা।

প্রশাসনের এই অভিযান অবশ্য আচমকা নয়। সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খাবারের মান এবং রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম, সল্টলেকের ৫ নম্বর সেক্টর, কাঁচরাপাড়া-সহ বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য সুরক্ষা দফতরের অভিযানে একাধিক অনিয়মের সন্ধান মিলেছিল। কোথাও পচা মাংস মজুত করে রাখার অভিযোগ উঠেছিল, আবার কোথাও খাবারে ছত্রাকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। সেই আবহেই বাঁকুড়ার খাতড়া ও মুকুটমণিপুরে প্রশাসনের অভিযান ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে চলা নিয়ে।

খাতড়ার অভিযানে একটি রেস্তোরাঁর রেফ্রিজারেটরে রাখা মাংস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই মাংস কোথা থেকে কেনা হয়েছিল, তার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় বিল বা নথি দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী। খাদ্যদ্রব্যের উৎস সম্পর্কে সঠিক নথি থাকা খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিষয়টি নিয়ে ওই রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে প্রশাসন।

অন্য একটি খাবারের দোকানে আরও গুরুতর অনিয়ম নজরে আসে। সেখানে রাখা ভাজা মাছ এবং ডিমের গায়ে ছত্রাক দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে খাবার সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, কিংবা পরিবেশনের আগে তার গুণমান পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন খাবার সাধারণ মানুষের কাছে পরিবেশন করা হলে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকেরা।

শুধু বাসি বা নিম্নমানের খাবার নয়, কিছু রেস্তোরাঁয় খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছিল এমন রাসায়নিক রং, যা খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয় বলে প্রশাসনের দাবি। খাবারকে দেখতে আকর্ষণীয় করার জন্য কৃত্রিম রং ব্যবহার নতুন কোনও বিষয় নয়। কিন্তু অনুমোদনহীন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে ওই ধরনের উপকরণ ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযানের সময় আরও একটি বিষয় প্রশাসনের নজরে আসে। কয়েকটি খাবারের দোকানে বাণিজ্যিক রান্নার কাজে গৃহস্থালির জন্য ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছিল। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রান্নার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও অনুমোদন মেনে গ্যাস ব্যবহারের কথা। তাই ওই সিলিন্ডারগুলি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।

খাতড়ার পাশাপাশি মুকুটমণিপুরের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলিতেও ছবিটা খুব একটা আলাদা ছিল না। পর্যটকদের আনাগোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় মুকুটমণিপুরে প্রতি বছরই বহু মানুষ হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবার খান। সেখানে খাদ্য সামগ্রীর গুণমান নিয়ে কোনও গাফিলতি যাতে না থাকে, সে কারণেই অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর।

মুকুটমণিপুরের কয়েকটি হোটেলে এমন কিছু খাবার তৈরির উপকরণ পাওয়া যায়, যার প্যাকেটে ব্যাচ নম্বর কিংবা মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখের কোনও উল্লেখই ছিল না। কোনও খাদ্যদ্রব্য কত দিন পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই তথ্যগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে এমন সামগ্রী নিয়ে প্রশাসনের আধিকারিকেরা আপত্তি তোলেন।

অভিযানের সময় একটি হোটেল থেকে আরও অস্বাভাবিক একটি সামগ্রী উদ্ধার হয়। সেখানে রান্নায় ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত বেসন। মানুষের খাবার তৈরিতে এই ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে খাদ্য সুরক্ষা দফতর।

এর পাশাপাশি মুকুটমণিপুরের অধিকাংশ পরিদর্শিত হোটেলের রান্নাঘরেই পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি চোখে পড়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। রান্নার জায়গা, ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক ক্ষেত্রে গাফিলতি দেখা যায়। রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা, খাদ্যদ্রব্য ঢেকে রাখা এবং কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা ভাবে সংরক্ষণ করার মতো মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর জোর দিয়েছে প্রশাসন।

অভিযানে যেসব দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নিয়মভঙ্গের অভিযোগ সামনে এসেছে, তাদের প্রত্যেককে নোটিস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সমস্ত ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না করা হলে পরবর্তী পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।

শুধু এক বার সতর্ক করেই বিষয়টি থামিয়ে দিতে চাইছে না প্রশাসন। যে সব প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বার একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়বে, তাদের বিরুদ্ধে খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে অ্যাডজুডিকেশনের প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের আধিকারিকেরা।

অতিরিক্ত জেলাশাসক চিরন্তন প্রামাণিক জানিয়েছেন, অভিযানে কয়েকটি জায়গায় মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া সামগ্রী ব্যবহারের নজির মিলেছে। পাশাপাশি রান্নাঘর ও বিভিন্ন সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রেও উদাসীনতা ধরা পড়েছে। এমন কিছু ফুড কালার এবং এসেন্স পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি খাবারে ব্যবহার করার অনুমতি নেই বলেও জানান তিনি।

চিরন্তনের বক্তব্য, নিয়মভঙ্গকারী দোকানগুলিকে নোটিস দিয়ে সাত দিনের মধ্যে ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার অভিযান চালানো হচ্ছে। সেই সব ক্ষেত্রে অ্যাডজুডিকেশনের প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও রকম আপস করা হবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।

প্রশাসনের এই অভিযানের পর প্রশ্ন উঠছে, পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলিতে নিয়মিত ভাবে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিদর্শন আরও বাড়ানো হবে কি না। কারণ মুকুটমণিপুরের মতো পর্যটনকেন্দ্রে বাইরে থেকে আসা মানুষ স্থানীয় খাবারের উপরই নির্ভর করেন। ফলে খাবারের মান নিয়ে সামান্য গাফিলতিও পর্যটকদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

খাতড়া ও মুকুটমণিপুরে প্রশাসনের এই অভিযান আপাতত খাবারের ব্যবসায়ীদের জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—শুধু খাবার পরিবেশন করলেই হবে না, তার মান, সংরক্ষণ, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং ব্যবহৃত উপকরণের বৈধতা নিয়েও নিয়ম মেনে চলতে হবে। সাত দিনের মধ্যে ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশের পর এখন নজর থাকবে পরবর্তী পরিদর্শনের দিকে। নিয়ম ভাঙলে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে প্রশাসন।

No Comments

    আরও পড়ুন

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved