Homeহাওড়াকয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলের তলায় হাওড়া, উল্টে গেল যাত্রীবোঝাই টোটো! ৪৭০০ কোটির মাস্টার প্ল্যানের ঘোষণা

কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলের তলায় হাওড়া, উল্টে গেল যাত্রীবোঝাই টোটো! ৪৭০০ কোটির মাস্টার প্ল্যানের ঘোষণা

নিউজ ডেস্ক; সকাল থেকেই আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ। তার পরেই শুরু মুষলধারে বৃষ্টি। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই কার্যত নাকাল হাওড়া
resizeplus_1758700064_kolkata-water

নিউজ ডেস্ক; সকাল থেকেই আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ। তার পরেই শুরু মুষলধারে বৃষ্টি। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই কার্যত নাকাল হাওড়া শহর। শহরের একাধিক নিচু এলাকা চলে যায় জলের তলায়। কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও আবার রাস্তার উপর দিয়ে স্রোতের মতো জল বয়ে যেতে দেখা যায়। জলমগ্ন রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম সমস্যায় পড়েন অফিসযাত্রী, স্কুলপড়ুয়া, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীরা। এরই মধ্যে কোনা তেঁতুলতলায় বেনারস রোডে রাস্তার গর্তে যাত্রীবোঝাই টোটো উল্টে যাওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনায় কয়েক জন যাত্রী আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। গোটা ঘটনাটি ধরা পড়েছে এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায়।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই হাওড়ার আকাশের পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল। সূর্যের দেখা মেলেনি বললেই চলে। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যাওয়ার পর শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। প্রথমে বিক্ষিপ্ত ভাবে বৃষ্টি হলেও পরে তার তীব্রতা বাড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি চলায় শহরের নিকাশি ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন নিচু এলাকায় জল জমতে শুরু করে।

হাওড়া শহরের শিবপুর, হাওড়া ময়দান, সালকিয়া, রামরাজাতলা, ঘুসুড়ি-সহ একাধিক এলাকায় জল জমে যায়। কোথাও রাস্তার উপর কয়েক ইঞ্চি জল দাঁড়িয়ে থাকে, আবার কোনও কোনও এলাকায় হাঁটুজল পার হয়। বহু জায়গায় নিকাশি নালা উপচে জল রাস্তায় চলে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাস্তার একাংশ কার্যত জলমগ্ন হয়ে যাওয়ায় যানবাহনের গতি কমে যায়। ছোট গাড়ি, টোটো, বাইক ও পথচারীদের চলাচলেও দেখা দেয় সমস্যা।

বৃষ্টির জল ঢুকে পড়ে বেশ কিছু দোকানেও। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাস্তার জল দোকানের ভিতরে ঢুকে পড়ায় মালপত্র সরাতে হয়। অনেক ব্যবসায়ীকে দোকানের সামনে জমা জল সরানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে শহরের স্বাভাবিক ছন্দ যে ভাবে থমকে যায়, তাতে ফের সামনে আসে হাওড়ার দীর্ঘদিনের জল জমার সমস্যা।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন স্কুলপড়ুয়ারা। সকাল থেকে বৃষ্টির মধ্যে স্কুলে যাওয়া এবং পরে জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় সমস্যায় পড়তে হয় ছোট ছোট পড়ুয়াদের। অভিভাবকদের অনেককেই জল পেরিয়ে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যেতে দেখা যায়। কোথাও জল জমে থাকার কারণে রিকশা বা টোটো চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেককে হেঁটেই জল পেরোতে হয়েছে।

অফিসযাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যায়। শহরের বিভিন্ন সংযোগকারী রাস্তায় জল জমে যাওয়ায় যানবাহনের গতি কমে যায়। জলমগ্ন রাস্তার কারণে কোথাও কোথাও যানজট তৈরি হয়। সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত সময় নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়েছে।

এর মধ্যেই কোনা তেঁতুলতলায় বেনারস রোডে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। রাস্তার উপর থাকা একটি গর্ত বৃষ্টির জলে ঢাকা পড়ে যাওয়ায় যাত্রীবোঝাই একটি টোটো সেটিতে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। টোটোতে থাকা কয়েক জন যাত্রী আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুর্ঘটনার দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তার খারাপ অবস্থা দীর্ঘদিনের। বৃষ্টির সময় গর্তে জল জমে গেলে তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না। ফলে পথ চলতি মানুষ এবং যানবাহনের চালকেরা বিপদের মুখে পড়েন। বিশেষ করে টোটো ও বাইকের মতো ছোট যানবাহনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেশি। মঙ্গলবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভও বাড়তে শুরু করেছে এলাকাবাসীর মধ্যে।

তবে শুধু রাস্তার গর্ত নয়, বৃষ্টির পর জল দ্রুত নামতে না চাওয়াও হাওড়ার বড় সমস্যা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মঙ্গলবারই প্রশাসনের তরফে একাধিক এলাকায় পাম্প বসিয়ে জল বের করার কাজ শুরু করা হয়। জমা জল দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পাম্পিং স্টেশন ও অতিরিক্ত পাম্প ব্যবহার করা হয়।

রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই জানিয়েছেন, দ্রুত জল নামানোর জন্য হাওড়ার বিভিন্ন প্রান্তে মোট ৭০টি পাম্প চালানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ভারী বৃষ্টির পরে তাৎক্ষণিক ভাবে জমা জল সরানোর কাজ যেমন চলছে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে হাওড়ার জল জমার সমস্যা মেটানোর জন্য বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারি মাস থেকে হাওড়ার নিকাশি ব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রায় ৪৭০০ কোটি টাকার একটি মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু বৃষ্টির সময় দ্রুত জল নামানো নয়, বরং শহরের নিকাশি ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে শক্তিশালী করা। কোন কোন এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে, কোথায় জল জমার প্রবণতা বেশি এবং কী ভাবে দ্রুত জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যায়—এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

হাওড়ার জল জমার সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। প্রতি বর্ষাতেই শহরের বিভিন্ন অংশে একই ছবি দেখা যায়। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই নিচু এলাকাগুলি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ফলে বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে, সাময়িক ভাবে পাম্প চালিয়ে জল সরানোর পাশাপাশি স্থায়ী সমাধান কবে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘোষিত ৪৭০০ কোটি টাকার মাস্টার প্ল্যান সেই দীর্ঘদিনের সমস্যার কতটা সমাধান করতে পারে, এখন সেটাই দেখার।

শহরের বাসিন্দাদের একাংশের মতে, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি রাস্তার গর্ত মেরামত এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। কারণ জল জমে থাকা রাস্তার সঙ্গে যদি বড় গর্ত যুক্ত হয়, তা হলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মঙ্গলবার কোনা তেঁতুলতলার টোটো দুর্ঘটনাই তার উদাহরণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ দিন হাওড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলমগ্ন রাস্তায় প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও বৃষ্টির জেরে জনজীবনের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। শিবপুর থেকে সালকিয়া, হাওড়া ময়দান থেকে রামরাজাতলা—একাধিক এলাকায় জল পেরিয়েই মানুষকে যাতায়াত করতে হয়েছে। শিবপুরের আইআইইএসটি ক্যাম্পাসেও জমেছে জল। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাজার, দোকানপাট এবং দৈনন্দিন যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই বৃষ্টির প্রভাব পড়ে।

এক দিনের প্রবল বৃষ্টিই ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল হাওড়ার নিকাশি সমস্যার গভীরতা। আপাতত ৭০টি পাম্পে জল সরানোর কাজ চলছে। কিন্তু শহরবাসীর নজর এখন আগামী বছরের জানুয়ারির দিকে। ৪৭০০ কোটি টাকার মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের জল জমার সমস্যা থেকে হাওড়া কতটা মুক্তি পায়, তারই অপেক্ষায় শহরবাসী।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved