
নিউজ ডেস্ক: নিম্নচাপের জেরে টানা বৃষ্টির মধ্যেই ফের ধস নামল পশ্চিম বর্ধমানের অন্ডালে। বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগেই আচমকা বিকট শব্দে মাটি ধসে পড়ায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে হরিপুর ৭/৯ কোলিয়ারির মণ্ডলপাড়া এলাকায়। অল্পের জন্য বড়সড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও ঘটনার পর থেকেই আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, এলাকায় থাকা বহু পুরনো পরিত্যক্ত খনিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ধসের আশঙ্কা রয়েছে। বর্ষা এলেই সেই ভয় আরও বাড়ে। এ বারও বৃষ্টির মধ্যেই ধস নামায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এলাকার নিরাপত্তা এবং পরিত্যক্ত খনি এলাকার স্থায়ী ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার ভোর আনুমানিক পাঁচটা নাগাদ। তখনও দিনের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। মণ্ডলপাড়ার জনবসতি এলাকায় আচমকাই বিকট শব্দ শোনা যায়। শব্দের উৎসের দিকে তাকাতেই স্থানীয়দের নজরে আসে মাটি ধসে যাওয়ার ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। আতঙ্কিত বাসিন্দারা ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর আরও বিপদের আশঙ্কায় ওই অংশে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ে সতর্কতা তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, যে এলাকায় ধস নেমেছে, তার কাছেই রয়েছে কোম্পানি আমলের একটি পুরনো পরিত্যক্ত খনি। বহু বছর আগে খনি বন্ধ হয়ে গেলেও তার আশপাশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে জনবসতি। তৈরি হয়েছে একের পর এক বাড়ি। ফলে খনির অস্তিত্ব এবং তার উপরে বা আশপাশের জমির স্থায়িত্ব নিয়ে বরাবরই উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে মাটির নীচের পরিস্থিতি বদলে গেলে ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায় বলেই তাঁদের দাবি।
এ দিনের ঘটনার পর সেই পুরনো আতঙ্কই আবার সামনে এসেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, এর আগেও ওই এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটেছে। শুধু ধস নয়, কয়েক বছর আগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছিল বলে দাবি তাঁদের। সেই সময় বিষয়টি ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড বা ইসিএল কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযোগ, তখন ছাই দিয়ে জায়গাটি ভরাট করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে ফের একই ধরনের ঘটনা ঘটায় ক্ষোভ বাড়ছে বাসিন্দাদের মধ্যে।
স্থানীয় বিজেপি যুব মোর্চার এক নেতার অভিযোগ, বারবার কর্তৃপক্ষকে জানানো সত্ত্বেও সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, একটি এলাকায় একাধিকবার ধস বা অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যেখানে মানুষের বসবাস রয়েছে, সেখানে ঝুঁকির জায়গাগুলি চিহ্নিত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর আরও দাবি, বার বার সতর্ক করার পরও যদি একই এলাকায় ফের ধস নামে, তা হলে দায়িত্ব এড়াতে পারে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেছেন স্থানীয় বাসিন্দা রাজেশ কুমার সিংহও। তাঁর বক্তব্য, ভোরে আচমকা যেভাবে মাটি ধসে পড়েছে, সেই সময় যদি কেউ ওই অংশে উপস্থিত থাকতেন, তা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। তাঁর মতে, ধসের জায়গার আশপাশে বসবাসকারী মানুষ সবসময়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে বৃষ্টির সময়ে মাটি কখন বসে যাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ মানতে নারাজ ইসিএল কর্তৃপক্ষ। সংস্থার আধিকারিক তারকেশ্বর সিংহ জানিয়েছেন, বর্ষাকালে খনি এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। যে জায়গায় এ বার ধস হয়েছে, সেখানেও অতীতে একটি পরিত্যক্ত খনি ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই পরিত্যক্ত খনিটি ছাই, বন ও মাটি দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
একই সঙ্গে বসতি গড়ে ওঠার বিষয়টিও সামনে এনেছেন ইসিএল আধিকারিক। তাঁর অভিযোগ, পরিত্যক্ত খনির আশপাশে বেশ কিছু মানুষ অবৈধ ভাবে বাড়িঘর তৈরি করেছেন। এর ফলে তাঁরা নিজেরাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। অর্থাৎ ধসের দায় এবং ঝুঁকির কারণ নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে ইসিএলের বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
তবে মতপার্থক্য থাকলেও আপাতত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আশ্বাস দিয়েছে ইসিএল। কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, ধসে যাওয়া অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে। পাশাপাশি বিপজ্জনক জায়গাটি ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে না পারেন। বর্ষার সময়ে আরও কোনও দুর্ঘটনা এড়াতে আপাতত এই ব্যবস্থাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন তুলছেন মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দারা। গর্তটি মাটি দিয়ে ভরাট করে এবং চারপাশে ব্যারিকেড বসিয়ে দিলেই কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব? যদি মাটির নীচে পুরনো খনি বা ফাঁপা অংশ থেকেই থাকে, তা হলে বৃষ্টির জল ঢোকার পরে ফের মাটি বসে যাওয়ার আশঙ্কা কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠছে। শুধু ধসের জায়গাটি সাময়িক ভাবে বন্ধ না করে গোটা এলাকার মাটির স্থায়িত্ব এবং পরিত্যক্ত খনির অবস্থাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
কারণ মণ্ডলপাড়া শুধু ফাঁকা খনি এলাকা নয়। এখানে বসবাস করেন বহু সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি ইসিএলের একাধিক কর্মীও এই এলাকায় থাকেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ফের একই ধরনের ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব আরও বড় হতে পারে। বিশেষ করে নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টি যদি আরও বাড়ে, তা হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মূল দাবি, শুধু তাৎক্ষণিক মেরামতি নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। পুরনো খনির অবস্থান, মাটির নীচের ফাঁপা অংশ, জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং বসতির নিরাপত্তা—সবকিছু একসঙ্গে পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বুধবার ভোরের ধস তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়, বরং অন্ডালের পরিত্যক্ত খনি ঘিরে বহু দিনের নিরাপত্তা-প্রশ্নকে ফের সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার, মাটি ভরাট ও ব্যারিকেডের পর প্রশাসন এবং ইসিএল আরও দীর্ঘমেয়াদি কোনও পদক্ষেপ করে কি না। নাকি পরবর্তী ভারী বৃষ্টির সঙ্গে ফের একই আতঙ্ক ফিরে আসবে—সেই উত্তরই খুঁজছেন মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দারা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments