
নিউজ ডেস্ক; একটানা বৃষ্টিতে ফের বিপর্যস্ত বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপের প্রভাবে মঙ্গলবার দিনভর কখনও ভারী, কখনও মাঝারি বৃষ্টি হয়েছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। আর সেই বৃষ্টির জেরেই ফুলেফেঁপে উঠেছে বাঁকুড়ার একাধিক নদী। দ্বারকেশ্বর, শিলাবতী, গন্ধেশ্বরী, কংসাবতী-সহ জেলার বিভিন্ন নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে দ্বারকেশ্বর নদীর জল বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় জলের তলায় চলে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভাদুল সেতু। ফলে বাঁকুড়া সদর শহরের সঙ্গে প্রায় ২০টি গ্রামের সরাসরি যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি চলার কারণে দ্বারকেশ্বর নদীতে জলস্তর ক্রমশ বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে নদীর জল ভাদুল সেতুর উপর দিয়ে বইতে শুরু করে। স্থানীয়দের দাবি, সেতুর উপর দিয়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট উচ্চতায় জল প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে সেতু পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নদীর জলস্তর বিপদসীমার উপরে থাকায় আপাতত এই পথে যান চলাচল কার্যত অসম্ভব।
ভাদুল সেতু বাঁকুড়া শহরের সঙ্গে জেলার একাধিক এলাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সানতোড়, বালিয়াড়া, সুরপানগর-সহ আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ নিয়মিত এই সেতু ব্যবহার করে বাঁকুড়া সদর শহরে যাতায়াত করেন। পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাজারহাট, সরকারি পরিষেবা কিংবা কর্মসূত্রে শহরে যাতায়াতের জন্য এই সেতুর উপর নির্ভর করতে হয় তাঁদের।
সেতু জলের তলায় চলে যাওয়ায় সেই স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থাই এখন বড় ধাক্কার মুখে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শহরে পৌঁছতে হলে তাঁদের বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাতে স্বাভাবিক পথের তুলনায় ১০ কিলোমিটারেরও বেশি অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। ফলে সময় যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে যাতায়াতের খরচও।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, অসুস্থ রোগী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা। স্থানীয়দের বক্তব্য, প্রতিদিনের যাতায়াতের জন্য যে সেতুটি তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বর্ষার সময় বারবার জলের তলায় চলে যায়। ফলে প্রতি বছরই বর্ষাকালে একই সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে নদীর জল দ্রুত বাড়লে কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গ্রামের কোনও বাসিন্দাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য বাঁকুড়া শহর বা সদর হাসপাতালের দিকে নিয়ে যেতে হলে বিকল্প রাস্তা ধরতে হচ্ছে। অতিরিক্ত পথ পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছতে সময় বেশি লাগছে। জরুরি পরিস্থিতিতে এই বাড়তি সময় বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে বলেই আশঙ্কা স্থানীয়দের।
শুধু চিকিৎসা নয়, পড়ুয়াদের দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হয়েছে। স্কুল, কলেজ বা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে অনেককে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্ষার সময় নদীর জল আরও বাড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়েও চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকেরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাদুল সেতু প্রতি বছরই বর্ষায় দ্বারকেশ্বরের জলে ডুবে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলে আসলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাঁদের দাবি, নদীর জলস্তর বাড়লে যাতে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়, সে জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি অথবা নতুন করে আরও উঁচু ও স্থায়ী সেতু তৈরির ব্যবস্থা করার দাবিও উঠেছে।
বাঁকুড়ার পরিস্থিতি শুধু ভাদুল সেতুতেই সীমাবদ্ধ নয়। লাগাতার বৃষ্টির প্রভাবে জেলার আরও বেশ কিছু জায়গায় নদী ও খালের জলস্তর বেড়েছে। পাত্রসায়র ব্লকেও বৃষ্টির কারণে নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে দোমনি খালের উপর থাকা একটি কংক্রিটের ভাষা পুল ভেঙে গিয়েছে। ফলে ওই পথ দিয়ে মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে খবর, পাত্রসায়র ব্লকের দোমনি খালের উপর থাকা ওই কংক্রিটের পুলটি আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল। লাগাতার বৃষ্টির মধ্যে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল কার্যত বন্ধ। এর ফলে পাত্রসায়র ব্লক সদর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি গ্রাম।
এই এলাকাতেও একই সমস্যার মুখে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাজার, স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি দফতর কিংবা অন্যান্য জরুরি কাজে ব্লক সদরে যাওয়ার জন্য যাঁরা ওই পুল ব্যবহার করতেন, তাঁদের এখন বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে। ফলে সময় ও দূরত্ব দু’টোই বাড়ছে।
বর্ষার মরসুমে বাঁকুড়ার বিভিন্ন নদী ও খালের জলস্তর বৃদ্ধি নতুন ঘটনা নয়। তবে এ বার নিম্নচাপের প্রভাবে একটানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। নদীগুলিতে জল বাড়ার পাশাপাশি নিচু এলাকাগুলিতে জল জমার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
দ্বারকেশ্বর নদীর জল ভাদুল সেতুর উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্রশাসনের তরফে স্থানীয়দের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অতিরিক্ত জলের স্রোতের মধ্যে সেতু পার হওয়ার চেষ্টা করলে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। তাই জল না কমা পর্যন্ত সেতু দিয়ে যাতায়াত না করার পক্ষেই মত স্থানীয় প্রশাসনের।
এদিকে নদীর জলস্তর আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে দ্বারকেশ্বর-সহ জেলার অন্যান্য নদীতেও জল বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আরও কিছু রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল দাবি, প্রতি বছর বর্ষায় একই সমস্যা যাতে না ফিরে আসে, তার জন্য স্থায়ী সমাধান করতে হবে। ভাদুল সেতু কেন বারবার জলের তলায় চলে যাচ্ছে, নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ এবং সেতুর উচ্চতা বিবেচনা করে ভবিষ্যতের জন্য কী পরিকাঠামো প্রয়োজন—তা নিয়ে প্রশাসনের তরফে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার দাবি উঠেছে।
অন্য দিকে, পাত্রসায়রের ভাঙা পুলটিও দ্রুত মেরামত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, কয়েকটি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন এই যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না হলে স্কুলপড়ুয়া থেকে রোগী—সকলকেই সমস্যায় পড়তে হবে।
সব মিলিয়ে নিম্নচাপের বৃষ্টিতে বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর বড় প্রভাব পড়েছে। এক দিকে দ্বারকেশ্বর নদীর জলে ডুবে গিয়েছে ভাদুল সেতু, অন্য দিকে দোমনি খালের কংক্রিটের পুল ভেঙে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে বহু গ্রামের যোগাযোগ। নদীর জলস্তর স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্ভোগ কত দিন চলবে, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি—বর্ষা এলেই যাতে ফের এই ছবির পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য স্থায়ী পরিকাঠামোগত সমাধান করা হোক।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments