Homeঅন্যান্যলাইফস্টাইলউত্তমের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল মেদিনীপুর, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ থেকে ‘বিকেলে ভোরের ফুল’—জড়িয়ে সিনেমার ইতিহাস

উত্তমের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল মেদিনীপুর, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ থেকে ‘বিকেলে ভোরের ফুল’—জড়িয়ে সিনেমার ইতিহাস

resizeplus_Screenshot 2026-09-02 124902_edited

নিউজ ডেস্ক; তখনও মেদিনীপুর ভেঙে দুই জেলা হয়নি। পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম—আজকের আলাদা প্রশাসনিক পরিচয় তখন ছিল না। সেই অবিভক্ত মেদিনীপুরের মাটি, জঙ্গল, ঝর্না, সমুদ্রসৈকত এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যে বহু বছর আগেই বাংলা চলচ্চিত্রের ক্যামেরাকে টেনে নিয়েছিল, তার সাক্ষী হয়ে রয়েছে একের পর এক সিনেমা। আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের নাম।

১৯৫৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল বিকাশ রায় পরিচালিত উত্তমকুমার অভিনীত ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’। ছবিটির একটি বড় অংশের শুটিং হয়েছিল তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায়। অনেকের মতে, এই ছবির শুটিংয়ের হাত ধরেই চলচ্চিত্রের লোকেশন হিসেবে বৃহত্তর মেদিনীপুরের আত্মপ্রকাশ। ঝাড়গ্রাম থেকে উদয়পুরের সমুদ্রসৈকত—বিচিত্র ভূপ্রকৃতিকে পর্দায় ভিন্ন ভিন্ন আবহে ব্যবহার করেছিলেন পরিচালক।

আজকের ঝাড়গ্রাম জেলার ওদলচুয়ার কেটকি ঝর্না এলাকাতেও ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’-এর গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল। সিনেমাটির অন্যতম স্মরণীয় গান—‘পথের ক্লান্তি ভুলে, স্নেহভরা কোলে তব…’। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সেই গান আজও বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে পরিচিত। ছবিতে গানের দৃশ্যে যে মরুভূমির আবহ দেখানো হয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিল মেদিনীপুরেরই একটি বিশেষ ভূপ্রকৃতি।

সেই সময় বাংলা ছবির বাজেট আজকের তুলনায় ছিল অনেকটাই কম। ফলে শুটিংয়ের জন্য দূর মরুভূমি বা বিদেশের লোকেশনে যাওয়ার সুযোগ সব পরিচালকের ছিল না। চিত্রনাট্যের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় ভূপ্রকৃতিকেই সাজিয়ে ক্যামেরায় অন্য পরিবেশ তৈরি করা হত। ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ঝাড়গ্রামের দহিজুড়ি থেকে কংসাবতীর দিকে যাওয়ার পথে বসন্তপুরের কাছে একটি এলাকা ছিল বালুময় ও শুষ্ক। অনেকটাই মরুভূমির মতো তার চেহারা। সেই জায়গাকেই সিনেমার প্রয়োজনে মরুভূমির আবহ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। দর্শকের চোখে সেটি হয়ে উঠেছিল অন্য এক ভূখণ্ড। অথচ তার নেপথ্যে ছিল মেদিনীপুরেরই পরিচিত মাটি।

শুটিংয়ের সময় অবশ্য মহানায়ক একা ছিলেন না। উত্তমকুমারের পাশাপাশি ছবিতে ছিলেন পরিচালক ও অভিনেতা বিকাশ রায় এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। শুটিংয়ের জন্য তাঁরা থাকতেন ঘাটশিলায়। সেখান থেকেই প্রতিদিন গাড়িতে করে নির্দিষ্ট লোকেশনে আসতেন শিল্পী ও কলাকুশলীরা। সে সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শুটিংয়ের পরিকাঠামো এবং যাতায়াতের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেদিনীপুরের বিভিন্ন প্রান্তে চলেছিল সেই ছবির কাজ।

শুধু জঙ্গল, ঝর্না বা বালুময় এলাকা নয়, অবিভক্ত মেদিনীপুরের সমুদ্রসৈকতও জায়গা করে নিয়েছিল বাংলা সিনেমায়। ঝাড়গ্রাম এবং দিঘা লাগোয়া উদয়পুরের সমুদ্রতটেও ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’-এর শুটিং হয়েছিল। ফলে একই ছবির জন্য জেলার একাধিক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে পর্দায় ব্যবহার করা হয়েছিল।

এর প্রায় দেড় দশক পরে ফের মহানায়কের উপস্থিতিতে চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সাক্ষী হয় পূর্ব মেদিনীপুর। ১৯৭৪ সালে পীযূষ বসু পরিচালিত ‘বিকেলে ভোরের ফুল’-এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের কাজ হয়েছিল দিঘা এবং কাঁথি এলাকায়। ছবির শুটিংয়ের জন্য বেশ কয়েক দিন দিঘায় ছিলেন উত্তমকুমার।

আজকের দিঘার সঙ্গে সেই সময়ের দিঘার বিস্তর ফারাক। এখন পর্যটনের মরসুমে সমুদ্রসৈকত থেকে হোটেলপাড়া—সর্বত্র মানুষের ভিড়। কিন্তু সত্তরের দশকে পরিস্থিতি ছিল অনেক শান্ত। পর্যটকের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক ভাবে কম। ফলে শুটিংয়ের কাজে খুব বেশি প্রশাসনিক বা জনসমাগমজনিত সমস্যা তৈরি হয়নি। তবে মহানায়ক উত্তমকুমার শুটিং করতে এসেছেন—এই খবর ছড়িয়ে পড়লেই স্থানীয় মানুষের উৎসাহের কমতি ছিল না। প্রিয় অভিনেতাকে এক ঝলক দেখার জন্য শুটিংয়ের জায়গার আশপাশে ভিড় জমাতেন তাঁরা।

‘বিকেলে ভোরের ফুল’-এর সঙ্গে কাঁথির কপালকুণ্ডলা মন্দিরেরও স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ছবির একটি দৃশ্যের প্রয়োজনে উত্তমকুমার এবং অভিনেত্রী সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় গিয়েছিলেন ওই মন্দিরে। সেই সময় মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন প্রয়াত নরেন্দ্রনাথ পুরী। শুধু মন্দিরের পটভূমি হিসেবেই তাঁকে ব্যবহার করা হয়নি, সিনেমার একটি অংশে তাঁকেও দেখা গিয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

কাঁথির বাসিন্দা সুদীপ মাইতির স্মৃতিতেও রয়েছে সেই শুটিংয়ের গল্প। তাঁর বয়স তখন নয় বা দশ বছর। তিনি নিজে শুটিংয়ের সময় সবটা প্রত্যক্ষ করেননি, তবে পরিবারের বড়দের মুখে মহানায়কের কাঁথিতে আসার কথা শুনেছিলেন। পরে কপালকুণ্ডলা মন্দিরের পুরোহিত নরেন্দ্রনাথ পুরীর সঙ্গে তাঁর কথাও হয়েছিল।

সুদীপের বক্তব্য অনুযায়ী, শুটিংয়ের সময় উত্তমকুমার মন্দিরের পুরোহিতকে একশো টাকা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে নরেন্দ্রনাথ পুরী নিজেই তাঁকে সেই ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন। আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো ঘটনাটি সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের স্থানীয় মানুষের কাছে মহানায়কের সঙ্গে এমন প্রত্যক্ষ স্মৃতি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।

মেদিনীপুরের চলচ্চিত্র-ইতিহাস নিয়ে কাজ করা আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক তথা শিক্ষক ভাস্করব্রত পতির কাছেও এই ইতিহাস যথেষ্ট গর্বের। তাঁর মতে, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ এখনও দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়। ঝাড়গ্রাম এবং উদয়পুরে ওই ছবির গানের শুটিং হয়েছিল। বৃহত্তর মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গা যে উত্তমকুমারের বহু জনপ্রিয় ছবির শুটিং লোকেশন হয়ে উঠেছিল, সেটি এলাকার মানুষের কাছে গর্বের বিষয়।

আজ প্রযুক্তির দৌলতে পুরনো সিনেমা ঘরে বসেই দেখা যায়। পর্দায় যখন উত্তমকুমারকে দেখা যায়, তখন হয়তো অধিকাংশ দর্শক জানেন না যে দৃশ্যটির নেপথ্যে রয়েছে মেদিনীপুরের কোনও অচেনা রাস্তা, ঝর্না, সমুদ্রসৈকত কিংবা মন্দির। সেই অজানা লোকেশনগুলিই এখন আঞ্চলিক ইতিহাসের অংশ।

মেদিনীপুরের ভূপ্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই সম্ভবত সেই সময়ের পরিচালকদের আকৃষ্ট করেছিল। অল্প বাজেটে কখনও মরুভূমি, কখনও সমুদ্রতট, কখনও জঙ্গল বা গ্রামীণ পরিবেশ—সবই তৈরি করা যেত একই জেলার ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যে। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বাংলা সিনেমার পর্দায় উঠে এসেছে বৃহত্তর মেদিনীপুরের বহু অচেনা মুখ।

উত্তমকুমারের সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই স্মৃতিগুলি আজও ছড়িয়ে রয়েছে দিঘা, উদয়পুর, কাঁথি, ঝাড়গ্রাম এবং আশপাশের এলাকায়। সিনেমা শেষ হয়ে গিয়েছে বহু বছর আগে, বদলে গিয়েছে লোকেশনও। কিন্তু পুরনো ছবির ফ্রেমে যখন সেই জায়গাগুলি ফিরে আসে, তখন স্থানীয় মানুষের কাছে তা নিছক সিনেমা থাকে না—হয়ে ওঠে নিজেদের এলাকার ইতিহাসের এক টুকরো জীবন্ত দলিল।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved