
নিউজ ডেস্ক : প্রায় ছ’বছর পর ফের আলোচনার কেন্দ্রে প্রয়াত অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের প্রাক্তন ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের মৃত্যু মামলা। ২০২০ সালের জুনে মুম্বইয়ের মালাডের একটি বহুতল ভবনের ১৪ তলা থেকে পড়ে দিশার মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনায় এ বার নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিল বম্বে হাই কোর্ট। বুধবার আদালত মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে এফআইআর দায়ের, দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানের বয়ান রেকর্ড এবং পুরনো সমস্ত নথি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি সারং ভি. কোটওয়াল এবং বিচারপতি রঞ্জিতসিংহ রাজা ভোঁসলের ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের বক্তব্য, মামলার তদন্ত নিরপেক্ষ ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে একজন অভিজ্ঞ ও উচ্চপদস্থ আধিকারিককে দায়িত্ব দিতে হবে। সেই আধিকারিকই দিশার বাবার বক্তব্য রেকর্ড করবেন এবং অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
২০২০ সালের ৮ জুন মুম্বইয়ের মালাডের একটি আবাসিক বহুতলের ১৪ তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হয় দিশা সালিয়ানের। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দিন পরই বান্দ্রায় নিজের ফ্ল্যাট থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতকে। দুই মৃত্যুর সময়ের ব্যবধান এবং দিশার সঙ্গে সুশান্তের পেশাগত সম্পর্কের কারণে পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছিল।
তবে দিশার মৃত্যুর ঘটনায় সেই সময় পুলিশের তরফে Accidental Death Report (ADR) নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এ বার দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান অভিযোগ করেন, তাঁর মেয়ের মৃত্যু নিয়ে পুলিশের তদন্ত যথেষ্ট ছিল না। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই নতুন করে তদন্তের আবেদন জানানো হয়।
দিশার পরিবারের তরফে দীর্ঘদিন ধরে তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল। বিশেষ করে পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ করা হলেও কেন নিয়মিত এফআইআর দায়ের করা হয়নি, তা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠে। আগস্টে শুনানির সময় বম্বে হাই কোর্ট মুম্বই পুলিশের কাছে জানতে চেয়েছিল, পরিবারের তরফে সন্দেহ প্রকাশ এবং অভিযোগ দায়েরের পরেও কেন শুধুমাত্র ADR করা হয়েছিল।
আদালতের সামনে আরও একটি বিষয় উঠে আসে—দিশার মৃত্যুর কয়েক বছর পরেও তাঁর পরিবারকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ADR-এর কপি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। সেই বিষয়েও আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই বুধবার মামলার তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ এল। আদালত জানিয়েছে, তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি মুম্বই পুলিশের সংশ্লিষ্ট থানাকে দ্রুত সিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
তবে আদালতের নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল—সিবিআই তদন্ত শুরু করছে মানেই কোনও ব্যক্তি অপরাধী, এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
অর্থাৎ, সিবিআই প্রথমে অভিযোগ, নথি, ফরেন্সিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ খতিয়ে দেখবে। তদন্তের ভিত্তিতে যদি কোনও আমলযোগ্য অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ করতে হবে। আর যদি তেমন কোনও অপরাধের প্রমাণ না মেলে, তা হলে তদন্তকারী সংস্থাকে আইনসম্মত ভাবে পরবর্তী নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানের বক্তব্যও সিবিআইকে রেকর্ড করতে হবে। তিনিই এই মামলায় নতুন তদন্তের আবেদন করেছিলেন। তাঁর আইনজীবী নীলেশ ওঝা আদালতের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ওঝার বক্তব্য, আদালত তদন্তের বিষয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। কারও বিরুদ্ধে তদন্তে প্রমাণ মিললে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না—এই বিষয়টিও আদালত পরিষ্কার করে দিয়েছে।
আদালতের নির্দেশের পর দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, এখন সিবিআই তদন্ত করবে। একই সঙ্গে এই সময় তাঁদের শক্ত থাকতে এবং ধৈর্য ধরতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দীর্ঘ সময় ধরে মেয়ের মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসা পরিবারের কাছে আদালতের এই নির্দেশ তাই গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে সিবিআই তদন্তের ফল কী দাঁড়ায়, তা জানতে আরও সময় লাগবে।
আদালতের নির্দেশের পর এখন তদন্তের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিক ভাবে সিবিআইয়ের হাতে যাওয়ার কথা। প্রথম ধাপে পুরনো তদন্তের নথি, ADR, ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি দিশার বাবার বক্তব্যও রেকর্ড করা হবে।
এর পর তদন্তকারী আধিকারিক ঘটনাস্থল, ফরেন্সিক তথ্য, প্রত্যক্ষ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আগের তদন্তের সমস্ত দিক খতিয়ে দেখতে পারেন। তদন্তে নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ছ’বছর আগে ঘটে যাওয়া দিশা সালিয়ানের মৃত্যু তাই আবারও আইনি তদন্তের কেন্দ্রে ফিরে এল। তবে আদালতের নির্দেশে যেমন সিবিআই তদন্তের পথ খুলেছে, তেমনই আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে—তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে অপরাধী হিসেবে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। ফলে এখন নজর সিবিআইয়ের তদন্তের দিকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments