Homeদক্ষিণ ২৪ পরগনাসন্দেশখালিভরা কটাল-বৃষ্টিতে রায়মঙ্গলের বাঁধে ১৫০ ফুট ধস, রাতেই মেরামত শুরু সন্দেশখালিতে

ভরা কটাল-বৃষ্টিতে রায়মঙ্গলের বাঁধে ১৫০ ফুট ধস, রাতেই মেরামত শুরু সন্দেশখালিতে

নিউজ ডেস্ক; এক দিকে পূর্ণিমার ভরা কটাল, অন্য দিকে টানা ভারী বৃষ্টি। দুইয়ের জোড়া চাপে সুন্দরবনের নদীগুলিতে জলস্তর বাড়তেই নতুন
Screenshot 2026-09-02 123244_edited

নিউজ ডেস্ক; এক দিকে পূর্ণিমার ভরা কটাল, অন্য দিকে টানা ভারী বৃষ্টি। দুইয়ের জোড়া চাপে সুন্দরবনের নদীগুলিতে জলস্তর বাড়তেই নতুন করে আতঙ্ক ছড়াল সন্দেশখালিতে। সোমবার গভীর রাতে রায়মঙ্গল নদীর বাঁধের প্রায় দেড়শো ফুট অংশে ধস নামায় বিপদের আশঙ্কায় রাতেই বাঁধ মেরামতির কাজে নামে সেচ দফতর। জেনারেটরের আলো জ্বেলে গ্রামের বাসিন্দাদের সহযোগিতায় শুরু হয় জরুরি সংস্কার। নদীর জল বাড়ার পাশাপাশি বৃষ্টি চলতে থাকায় বাঁধের পরিস্থিতি নিয়ে এখনও উদ্বেগ কাটেনি স্থানীয়দের।

ঘটনাটি ঘটেছে সন্দেশখালি-২ ব্লকের মণিপুর এলাকার তালতলা কাছারিপাড়ায়। রায়মঙ্গল নদীর তীরবর্তী এই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই নদীবাঁধের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বাঁধে কোনও রকম বড় ক্ষতি হলেই নোনা জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকে বিস্তীর্ণ এলাকায়। ফলে সোমবার গভীর রাতে নদীবাঁধে ধসের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন গ্রামবাসীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক দিন ধরে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছিল। একই সঙ্গে পূর্ণিমার ভরা কটালের কারণে নদীগুলিতে জলও বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে রায়মঙ্গলের জলের চাপ এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির জেরে বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধের একটি বড় অংশে ধস নামে। প্রায় ১৫০ ফুট এলাকা জুড়ে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

বাঁধ ভেঙে সম্পূর্ণ ভাবে নদীর জল গ্রামে ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, সুন্দরবনের নদীর জলে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি। নদীর নোনা জল এক বার কৃষিজমি এবং মাছের ভেড়িতে ঢুকে পড়লে তার ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেই আশঙ্কাতেই রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পৌঁছয় সেচ দফতরের কাছেও।

গভীর রাতেই সেচ দফতরের আধিকারিক ও কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতির কাজ শুরু করেন। অন্ধকারের কারণে কাজ যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হয়। কৃত্রিম আলোর নিচে শুরু হয় ধসপ্রবণ অংশ মেরামতের কাজ। প্রশাসনিক কর্মীদের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও সেই কাজে হাত লাগান। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও রাতের অন্ধকারে বাঁধ সংস্কারে অংশ নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

প্রাথমিক ভাবে বাঁধের ফাটল এবং ধসে যাওয়া অংশে মাটির বস্তা ফেলে সাময়িক ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, নদীর জল যাতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দিয়ে সরাসরি ভিতরের দিকে ঢুকতে না পারে। জরুরি ভিত্তিতে এই ধরনের মেরামতি করে আপাতত বাঁধটিকে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।

তবে এই অস্থায়ী ব্যবস্থায় আদৌ কতটা সুরক্ষা মিলবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, রায়মঙ্গলের মতো বড় নদীর প্রবল স্রোত এবং জোয়ারের চাপ সামলাতে শুধুমাত্র মাটির বস্তা বা বাঁশের পাইলিং কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতি বছর বর্ষা বা কটালের সময় একই ধরনের বিপদের মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে সাময়িক সংস্কারের পরিবর্তে স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন।

তালতলা কাছারিপাড়ার বাসিন্দাদের স্মৃতিতে এখনও তাজা কয়েক বছর আগের নদীবাঁধ ভাঙনের ঘটনা। সেই সময় একাধিক জায়গায় বাঁধ ভেঙে নদীর নোনা জল গ্রামাঞ্চলে ঢুকে পড়েছিল। বিস্তীর্ণ এলাকার বসতবাড়ি, রাস্তা এবং চাষের জমি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ধান এবং মাছ চাষ। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকশো বিঘা জমি নোনা জলে ক্ষতির মুখে পড়েছিল। বহু চাষি ও মৎস্যচাষিকে দীর্ঘ সময় ধরে লোকসান সামলাতে হয়েছিল।

সেই অভিজ্ঞতার কারণেই এ বার সামান্য ধসের খবরেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নদীপারের মানুষ। তাঁদের আশঙ্কা, রাতের ধস যদি দ্রুত আরও বড় আকার নেয় এবং একই সঙ্গে নদীর জলস্তর বাড়তে থাকে, তা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে পূর্ণিমার কটালের সময়ে নদীতে জল ও স্রোতের চাপ বাড়ায় বাঁধের দুর্বল অংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেচ দফতরের তরফে আপাতত জরুরি মেরামতির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, শুধু কোনও একটি জায়গায় ধস নামার পর সেখানে মেরামতি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রায়মঙ্গল নদীর তীরবর্তী দীর্ঘ বাঁধের বিভিন্ন অংশ নিয়মিত পরীক্ষা করে দুর্বল জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে। কোথাও মাটি সরে গেলে বা ফাটল দেখা দিলে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের আরও দাবি, নদীবাঁধকে দীর্ঘস্থায়ী ভাবে শক্তিশালী করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হোক। বিশেষ করে রায়মঙ্গলের মতো নদীর ক্ষেত্রে কংক্রিটের স্থায়ী বাঁধ তৈরির দাবি তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের যুক্তি, বাঁশের পাইলিং, মাটির বস্তা কিংবা অন্যান্য অস্থায়ী পদ্ধতিতে কোনও ভাবে একটি বর্ষা বা একটি কটাল সামাল দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বছরের পর বছর নদীর স্রোত ও জলের চাপ সামলাতে হলে আরও মজবুত পরিকাঠামো প্রয়োজন।

সুন্দরবনের নদীবাঁধ শুধু মাটি বা ইট-কংক্রিটের কাঠামো নয়, নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকারও অন্যতম রক্ষাকবচ। বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিজমি, মাছের ভেড়ি এবং বসতবাড়ি। অনেক ক্ষেত্রে জমির উর্বরতাও দীর্ঘ সময়ের জন্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই বাঁধ রক্ষার বিষয়টি সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত।

এ বার রাতের ধসের পরে গ্রামের মানুষ নিজেরাই প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেরামতির কাজে নেমেছেন। আপাতত সেই তৎপরতায় বড় বিপদ এড়ানো গিয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি এবং নদীর জলস্তর বাড়তে থাকায় আগামী কয়েক দিনই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রায়মঙ্গলের বাঁধে রাতের এই ধস আবারও সুন্দরবনের নদীবাঁধের দুর্বলতার প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। সাময়িক মেরামতি কত দিন পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারবে, তা সময়ই বলবে। তবে নদীপারের মানুষের দাবি স্পষ্ট—বার বার জরুরি মেরামতির বদলে এবার চাই দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী বাঁধ সুরক্ষা। না হলে ভরা কটাল, বর্ষা কিংবা প্রবল বৃষ্টির প্রতিটি পর্বেই নতুন করে আতঙ্কে কাটাতে হবে নদীর পাড়ের মানুষকে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved