
নিউজ ডেস্ক; বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল দুই স্কুলপড়ুয়া। একজন জানিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যাবে, অন্য জনের দাবি ছিল পড়তে যাওয়ার। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও কেউই বাড়ি ফেরেনি। প্রথমে অপেক্ষা, তার পর উদ্বেগ এবং শেষ পর্যন্ত থানায় অভিযোগ—পরিবারের উৎকণ্ঠার মধ্যে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। শেষ পর্যন্ত রিষড়া থেকে বহু দূরে কাকদ্বীপে হদিস মিলল ওই দুই নাবালকের। শনিবার রাতে তাঁদের উদ্ধার করে রিষড়া থানার পুলিশ।
ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, দুই পড়ুয়ার কাছেই কোনও মোবাইল ফোন ছিল না। ফলে তাঁরা কোথায় গিয়েছে বা তাঁদের সঙ্গে কারও যোগাযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে কোনও তথ্য ছিল না। উদ্ধার হওয়ার পরও দুই নাবালক কী ভাবে রিষড়া থেকে কাকদ্বীপে পৌঁছল, কেনই বা তারা এতটা দূরে চলে গেল—এই প্রশ্নগুলির সম্পূর্ণ উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, রিষড়া থানা এলাকার ওই দুই নাবালকের মধ্যে এক জন শনিবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বেরিয়েছিল। সাধারণত খেলার জন্য বাড়ির বাইরে গেলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ফিরে আসত সে। কিন্তু এ দিন সময় গড়িয়ে গেলেও তার দেখা মেলেনি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত বাড়তে থাকায় পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তা বাড়তে শুরু করে।
রাত প্রায় ১০টা বেজে গেলেও ছেলেটি বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন নিজেদের মতো করে খোঁজ শুরু করেন। পরিচিতদের বাড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ-সহ বিভিন্ন জায়গায় সন্ধান চালানো হয়। কিন্তু কোথাও তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত কোনও উপায় না দেখে পরিবারের সদস্যরা রিষড়া থানায় গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তল্লাশি শুরু করা হয়। রিষড়া থানার ওসি পরমেশ্বর প্রামাণিকের তৎপরতায় বিভিন্ন সূত্র খতিয়ে দেখা হয়। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই পরে জানা যায়, দুই নাবালকের অবস্থান রিষড়ায় নয়, বরং কাকদ্বীপে। রাতেই সেখানে যোগাযোগ করে দুই পড়ুয়ার সন্ধান মেলে। পরে তাদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
অন্য নাবালকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিও প্রায় একই সময়ের। তার পরিবারের দাবি, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ পড়তে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। পরিবারের কাছে বলা হয়েছিল, বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনা করবে। কিন্তু এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। সন্ধ্যার পর সময় যত বাড়তে থাকে, পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগও তত বাড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই পড়ুয়াও বাড়িতে নেই। কোথায় গিয়েছে, কার সঙ্গে রয়েছে—কিছুই বুঝতে পারছিলেন না পরিবারের লোকজন। পরে পুলিশি তৎপরতায় তারও কাকদ্বীপে থাকার খবর সামনে আসে। দু’জনকেই উদ্ধার করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে তদন্তকারীদের কাছেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দুই নাবালক রিষড়া থেকে কাকদ্বীপে পৌঁছল কী ভাবে? দূরত্বের কথা বিবেচনা করলে এই যাত্রাপথ একেবারেই ছোট নয়। পরিবারের দাবি, উদ্ধার হওয়ার পরে ওই পড়ুয়া জানিয়েছে যে সে ট্রেনে উঠেছিল। কিন্তু কোথা থেকে ট্রেনে উঠেছিল, কোথায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠেছিল কিংবা তার সঙ্গে অন্য কেউ ছিল কি না, সে বিষয়ে সে স্পষ্ট কোনও তথ্য দিতে পারেনি।
দুই পরিবারের কাছ থেকেই আরও জানা গিয়েছে, কোনও নাবালকের কাছেই মোবাইল ফোন ছিল না। ফলে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ভাবে কোনও তথ্য পাওয়ার সুযোগও ছিল না পরিবারের। মোবাইল না থাকা অবস্থায় তারা কী ভাবে কাকদ্বীপে পৌঁছল এবং সেখানে পৌঁছনোর পর কী করছিল, তা নিয়েই এখন ধোঁয়াশা রয়েছে।
উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা দুই পড়ুয়ার সঙ্গে কথা বলেন। স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম লক্ষ্য ছিল, তারা নিরাপদে রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। কিন্তু নিজেদের যাত্রাপথ সম্পর্কে দুই নাবালক বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেনি বলে পরিবারের দাবি। ফলে আপাতত নিখোঁজ হওয়ার কারণ নিয়ে কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না।
পরিবারগুলির তরফে আরও দাবি করা হয়েছে, বাড়িতে কোনও ধরনের অশান্তি বা বড়সড় ঝামেলা ছিল না। এমন কোনও পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি, যার কারণে দুই নাবালক বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে। ফলে তাদের আচমকা এত দূরে চলে যাওয়ার পিছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে, তা পরিবারের কাছেও পরিষ্কার নয়।
ঘটনার পর রিষড়া থানার পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে দুই পরিবার। তাঁদের বক্তব্য, সন্তানদের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর দ্রুত পুলিশি পদক্ষেপ না হলে উদ্বেগ আরও বাড়ত। পুলিশের তৎপরতায় অল্প সময়ের মধ্যেই দুই নাবালকের সন্ধান মেলায় স্বস্তি ফিরেছে পরিবারগুলিতে।
এক নাবালকের বাবা বলেন, “ছেলেকে খুঁজে পেয়েছি। বড়বাবুকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।” সন্তানকে নিরাপদে ফিরে পাওয়ার পর পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
তবে উদ্ধার করেই তদন্ত শেষ হচ্ছে না। বরং দুই নাবালকের কাকদ্বীপে পৌঁছনোর ঘটনাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেরাই সেখানে গিয়েছিল, নাকি কারও সঙ্গে গিয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রেনে যাতায়াতের সম্ভাবনার কথাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তারা কোথা থেকে ট্রেনে উঠেছিল, পথে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না, কাকদ্বীপে তাদের গন্তব্য কোথায় ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
এ ধরনের ঘটনায় নাবালকদের নিরাপত্তা নিয়েও স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বাড়ি থেকে বেরনোর আগে তারা যে কারণ জানিয়েছিল, তার সঙ্গে পরবর্তী গতিবিধির কোনও মিল নেই। ফলে তাদের বক্তব্য, যাতায়াতের পথ এবং কাকদ্বীপে পৌঁছনোর পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত কারণ বোঝার চেষ্টা চলছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় স্বস্তি, দুই স্কুলছাত্রই নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু তারা কেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এত দূরে চলে গেল, সেই রহস্য এখনও কাটেনি। কোনও তৃতীয় ব্যক্তি এই ঘটনায় যুক্ত ছিল কি না, নাকি নিছকই কোনও সিদ্ধান্তের কারণে দুই নাবালক কাকদ্বীপে পৌঁছে গিয়েছিল—তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। পুলিশ সেই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খুঁজছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments