Homeদেশ৭৫ লক্ষ পুণ্যার্থী, তবু নির্বিঘ্ন রেল পরিষেবা!

৭৫ লক্ষ পুণ্যার্থী, তবু নির্বিঘ্ন রেল পরিষেবা!

1, 2026, 03_16_23 PM

নিউজ ডেস্ক: শ্রাবণী মেলা ২০২৬-কে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর যাতায়াত সামলাতে বড়সড় প্রস্তুতি নিয়েছিল পূর্ব রেল। তীর্থযাত্রীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাত্রা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্টেশনগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত টিকিট ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা পরিষেবা এবং বিশেষ ট্রেন পরিচালনার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। উৎসবের মরসুমে সেই পরিকল্পনার ফলও মিলেছে বলে পূর্ব রেলের দাবি। ২৮ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত পূর্ব রেলের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টিং স্টেশনে প্রায় ৭৫.২ লক্ষ তীর্থযাত্রী রেল পরিষেবা ব্যবহার করেছেন।

গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলেই রেলের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে এই স্টেশনগুলিতে মোট তীর্থযাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৮ লক্ষ। চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭৫,২১,৭১০, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০.৫৪ শতাংশ বেশি।

শ্রাবণী মেলার সময় বিপুল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে পূর্ব রেলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনকে বিশেষ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছিল। জসিডিহ, দেওঘর, বাসুকিনাথ, বৈদ্যনাথধাম, সুলতানগঞ্জ এবং তারকেশ্বর— এই তীর্থকেন্দ্র সংলগ্ন স্টেশনগুলিতে যাত্রী পরিষেবার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাসুকিনাথ, তারকেশ্বর ও দেওঘরে বেড়েছে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা

পূর্ব রেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি শ্রাবণী মেলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থকেন্দ্রে যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বাসুকিনাথে প্রায় ২৪.৬৭ শতাংশ, তারকেশ্বরে প্রায় ১৯.৯১ শতাংশ এবং দেওঘরে প্রায় ১৫.৪৫ শতাংশ যাত্রী বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছে।

এক দিনে সর্বাধিক তীর্থযাত্রীর উপস্থিতির ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য রেকর্ড। ৩ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে তারকেশ্বর স্টেশনে প্রায় ১,৫৯,১০৮ জন তীর্থযাত্রী পরিষেবা নিয়েছেন বলে পূর্ব রেলের তথ্য। অন্য দিকে, ১৭ আগস্ট জসিডিহ স্টেশনে প্রায় ৯২,৮৯৮ জন যাত্রীর উপস্থিতি ছিল।

এই বিপুল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল রেলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত শ্রাবণ মাসে বিভিন্ন তীর্থস্থানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তদের আগমন ঘটে। ফলে শুধু ট্রেনের সংখ্যা বাড়ালেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। স্টেশন চত্বর, প্ল্যাটফর্ম, টিকিট কাউন্টার, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ— সর্বত্র সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়।

ভিড় সামলাতে তৈরি বড় হোল্ডিং এরিয়া

তীর্থযাত্রীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে পূর্ব রেল বিভিন্ন স্টেশনে বিশেষ হোল্ডিং এবং অ্যাসেম্বলি এরিয়া তৈরি করেছিল। জসিডিহে প্রায় ৮৪,৫০০ বর্গফুট, দেওঘরে প্রায় ৩০,০০০ বর্গফুট এবং বাসুকিনাথে প্রায় ১২,০০০ বর্গফুট জায়গা যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

এ ছাড়াও বৈদ্যনাথধামে প্রায় ৫,৮০০ বর্গফুট, সুলতানগঞ্জে প্রায় ১,৭০০ বর্গমিটার এবং তারকেশ্বরে প্রায় ১,৪৮০ বর্গমিটার জায়গায় যাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। তারকেশ্বরের ওই নির্দিষ্ট হোল্ডিং এলাকায় প্রায় ৬,০০০ যাত্রীকে একসঙ্গে সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল বলে জানানো হয়েছে।

এই ধরনের নির্দিষ্ট অপেক্ষমাণ এলাকা তৈরি করার ফলে প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং যাত্রীদের নিয়ন্ত্রিতভাবে ট্রেনে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভিড়ের সময় হুড়োহুড়ি বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাও অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

টিকিটের লাইনে চাপ কমাতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা

শ্রাবণী মেলার সময় টিকিট কাউন্টারগুলিতে দীর্ঘ লাইন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই পরিস্থিতি এড়াতে পূর্ব রেল ইউটিএস কাউন্টার, স্বয়ংক্রিয় টিকিট ভেন্ডিং মেশিন এবং মোবাইল টিকিটিং পরিষেবার উপর জোর দেয়।

ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন মিলিয়ে ৪৯টি ইউটিএস কাউন্টার, ২৮টি এটিভিএম এবং ৪৯টি মোবাইল ইউটিএস কাউন্টার চালু রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, যাত্রীদের দ্রুত টিকিট দেওয়ার পাশাপাশি কাউন্টারের সামনে ভিড় কমানো।

ডিজিটাল এবং মোবাইলভিত্তিক পরিষেবা বৃদ্ধির ফলে তীর্থযাত্রীদের সময় বাঁচানোর পাশাপাশি স্টেশন ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নিরাপত্তায় নজরদারির জোরদার ব্যবস্থা

বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে মোট ৩০৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছিল। স্টেশনগুলির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নজরদারি চালানোর পাশাপাশি পরিস্থিতির উপর রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়।

নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছিল। তারকেশ্বর এবং সুলতানগঞ্জে বিশেষ ওয়ার রুমও তৈরি করা হয়। এই কেন্দ্রগুলি থেকে যাত্রী চলাচল, ভিড়ের চাপ এবং জরুরি পরিস্থিতির উপর নজর রাখা সম্ভব হয়েছে।

নিরাপত্তার দায়িত্বে বিশেষভাবে মোতায়েন ছিলেন ৮৯০ জন আরপিএফ জওয়ান। এর মধ্যে তারকেশ্বরে ৪১০ জন, সুলতানগঞ্জে ১২০ জন, জসিডিহে ২৭০ জন, দেওঘরে ৩০ জন, বৈদ্যনাথধামে ১৫ জন এবং বাসুকিনাথে ৪৫ জন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করেছেন।

চিকিৎসা পরিষেবাতেও বিশেষ গুরুত্ব

তীর্থযাত্রীদের মধ্যে প্রবীণ, শিশু এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির সংখ্যা বেশি থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। পূর্ব রেলের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জায়গায় মোট ৯টি মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বুথ এবং ৯টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

মেলা চলাকালীন প্রায় ১৬,০৬৩টি চিকিৎসা সংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

পরিচ্ছন্নতা এবং বিশেষভাবে সক্ষম যাত্রীদের সুবিধার জন্যও পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পানীয় জল, শৌচালয়, সাহায্য কেন্দ্র এবং যাত্রী নির্দেশিকার মতো পরিষেবাগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মোবাইল বায়ো-টয়লেট থেকে ‘মে আই হেল্প ইউ’ বুথ

বিপুল জনসমাগমের সময় মৌলিক যাত্রী সুবিধা বজায় রাখা রেলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই কারণে বিভিন্ন স্টেশনে পানীয় জলের বুথ ও কুলার, পে-অ্যান্ড-ইউজ শৌচালয় এবং মোবাইল বায়ো-টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তারকেশ্বরে ২০টি মোবাইল বায়ো-টয়লেট ব্যবহার করা হয়। জসিডিহ, দেওঘর, বৈদ্যনাথধাম এবং বাসুকিনাথেও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মোবাইল ইউনিট রাখা হয়েছিল।

বিশেষভাবে সক্ষম যাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি ‘মে আই হেল্প ইউ’ বুথ, তথ্য প্রদর্শন ব্যবস্থা এবং স্টেশনভিত্তিক যাত্রী নির্দেশিকা রাখা হয়েছিল যাতে অপরিচিত যাত্রীরাও সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন।

২,০৭৫টি মেলা স্পেশাল ট্রিপ

শ্রাবণী মেলার বিপুল ভিড় সামলাতে পূর্ব রেল ট্রেন পরিষেবার ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেয়। যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছনো সহজ করতে মোট ২,০৭৫টি মেলা স্পেশাল ট্রেন পরিচালনা করা হয়েছে।

ব্যস্ত দিনগুলিতে অতিরিক্ত ট্রেনের পাশাপাশি যাত্রী ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, স্টেশনে বিশেষ নজরদারি এবং ওয়ার রুম থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। যাত্রীদের সঠিক সময়ে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং জরুরি পরিষেবা সহজলভ্য রাখার উপরও জোর দেওয়া হয়েছিল।

পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানিয়েছেন, শ্রাবণী মেলা ২০২৬-এর সফল পরিচালনা যাত্রী নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন ট্রেন পরিষেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পূর্ব রেলের দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরের শ্রাবণী মেলায় তীর্থযাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি করছে পূর্ব রেল। অতিরিক্ত ট্রেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চিকিৎসা পরিষেবা, হোল্ডিং এরিয়া এবং আধুনিক টিকিটিং পরিষেবা— সব মিলিয়ে বৃহৎ তীর্থযাত্রী সমাগম সামলানোর ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। আগামী বছরগুলিতে আরও বড় তীর্থযাত্রী ভিড় সামলাতেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved