
নিউজ ডেস্ক; চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন এক সময়ের দাপুটে তৃণমূল নেতা রাজীব ঘোষাল। এক সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত ছিলেন তিনি। বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড় এলাকার এই নেতাকে শনিবার রাতে কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রবিবার তাঁকে বাঁকুড়া জেলা আদালতে হাজির করানো হয়। আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় বেলিয়াতোড় থানা এলাকায় তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান ওঠে বলে জানা গিয়েছে।
রাজীবের গ্রেপ্তারের ঘটনায় বাঁকুড়ার রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এক সময়ে তৃণমূলের যুব সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই নেতার বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগের তদন্তে ইতিমধ্যেই এক জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই রাজীবের নাম উঠে আসে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের গতি বাড়ে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গোটা ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। বেলিয়াতোড় থানায় এক স্থানীয় বাসিন্দা তৃণমূল নেতা পল্লব পাণ্ডের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগকারীর দাবি ছিল, তৃণমূলের আমলে তাঁকে বড়জোড়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই চাকরির বিনিময়ে তাঁর কাছ থেকে ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার পর চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও ওই ব্যক্তি কোনও চাকরি পাননি। এরপর তিনি একাধিক বার নিজের টাকা ফেরত চেয়েছিলেন বলেও দাবি। কিন্তু টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত পুলিশের দ্বারস্থ হন তিনি।
লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বেলিয়াতোড় থানার পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। অভিযোগের ভিত্তিতে পল্লব পাণ্ডেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে চান, চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় আর কেউ যুক্ত ছিলেন কি না। সেই জিজ্ঞাসাবাদেই রাজীব ঘোষালের নাম উঠে আসে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
এরপর রাজীবের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করে পুলিশ। শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে কলকাতা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রবিবার বাঁকুড়া জেলা আদালতে পেশ করা হলে আদালত চত্বরে এবং বেলিয়াতোড় থানা এলাকায় তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় কয়েক জন ‘চোর চোর’ স্লোগান দেন।
রাজীব ঘোষালের রাজনৈতিক পরিচিতিও এই ঘটনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বেলিয়াতোড় এলাকায় এক সময় তাঁকে তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে দেখা হত। তৃণমূলের যুব সংগঠন তৈরি হওয়ার পর বাঁকুড়া জেলার সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়েই দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল বলে তৃণমূলের অন্দরে আলোচনা ছিল।
রাজনৈতিক উত্থানের সেই সময় রাজীবের যথেষ্ট প্রভাব ছিল বলেও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি। ফলে চাকরির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে বর্তমান মামলার অভিযোগকে এক করে দেখার আগে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
পুলিশের তদন্তের মূল বিষয় এখন চাকরি দেওয়ার নামে টাকা লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। অভিযোগকারীর কাছ থেকে ঠিক কী ভাবে টাকা নেওয়া হয়েছিল, সেই টাকা কোথায় গিয়েছে, চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিলেন—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি এই ধরনের আরও কোনও অভিযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
চাকরির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে উঠেছে। এই ঘটনায় বড়জোড়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। চাকরি না পাওয়ার পরে টাকা ফেরত চেয়েও ফল না মেলায় অভিযোগকারী পুলিশের দ্বারস্থ হন।
রাজীবের গ্রেপ্তারের পরে এখন তদন্ত কোন দিকে এগোয়, সেটাই দেখার। পুলিশ তাঁর সঙ্গে পল্লব পাণ্ডের যোগাযোগ, অভিযোগকারীর সঙ্গে তাঁদের কথাবার্তা এবং টাকা লেনদেনের সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীরা যদি আরও কারও যোগ পান, তা হলে এই মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়তে পারে।
এ দিকে, রাজীবকে আদালতে তোলার সময় ‘চোর চোর’ স্লোগান ঘিরেও এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা এখনও আদালতে বিচারাধীন। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই। তবে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে চাকরির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের তদন্তে গ্রেপ্তার—দুই মিলিয়ে ঘটনাটি বাঁকুড়ার রাজনৈতিক পরিসরে যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছে।
এখন পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হতে পারে, অভিযোগকারীর কাছ থেকে নেওয়া ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা সংক্রান্ত লেনদেনে রাজীবের ভূমিকা ঠিক কী ছিল এবং চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পিছনে কোনও বৃহত্তর চক্র কাজ করছিল কি না। সেই উত্তরই এই মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments