Homeকলকাতাযাদবপুরে ১০ হাজার কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-কে নিশানা শুভেন্দুর, ‘আমি অসুখ জানি, ওষুধও জানি’

যাদবপুরে ১০ হাজার কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-কে নিশানা শুভেন্দুর, ‘আমি অসুখ জানি, ওষুধও জানি’

নিউজ ডেস্ক : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই শুক্রবার সেখানে বড়সড় ‘বন্দে মাতরম’ কর্মসূচিতে যোগ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
1611581598_shironam_suvendu

নিউজ ডেস্ক : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই শুক্রবার সেখানে বড়সড় ‘বন্দে মাতরম’ কর্মসূচিতে যোগ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, প্রায় ১০ হাজার কণ্ঠে একসঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হয়। অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই যাদবপুর চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক ছাত্র সংঘর্ষ এবং ক্যাম্পাসের ভিতরে বিভিন্ন স্লোগানকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, এ দিনের কর্মসূচি তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একাধিকবার কড়া মন্তব্য করেছিলেন শুভেন্দু। এ দিন সেই সুর আরও জোরালো করে তিনি সরাসরি নিশানা করেন যাদবপুরের একাংশ পড়ুয়া এবং ‘আজাদি’ স্লোগানকে।

শুভেন্দুর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর মন্তব্য— ‘আমি অসুখ জানি, ওষুধও জানি।’ যাদবপুরের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি যে কড়া অবস্থান নিতে চলেছেন, সেই বার্তাই এই মন্তব্যের মাধ্যমে দিতে চেয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।

‘আজাদি’ স্লোগান নিয়ে প্রশ্ন

এ দিনের সভায় শুভেন্দু অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের মতো বিষয়গুলির পরিবর্তে ‘আজাদি’ স্লোগানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, স্বাধীন দেশেই আবার কীসের ‘আজাদি’?

স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঋষি অরবিন্দ, বিনয়-বাদল-দীনেশ এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বহু বিপ্লবীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে। সেই স্বাধীনতার দেশে ফের ‘আজাদি’র দাবি কেন উঠবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

যাদবপুরের দেওয়ালে ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ ধরনের স্লোগান নিয়েও এ দিন সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে কাশ্মীর, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এবং সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনও আপস করা হবে না।

‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ প্রসঙ্গে আক্রমণ

যাদবপুরের একাংশকে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ বলে আক্রমণ করার অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও শুভেন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ পড়ুয়াকে একই ভাষায় নিশানা করেছিলেন। ২২ অগস্ট ভবানীপুরের একটি সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেছিলেন, যাদবপুরে একাংশ পড়ুয়া জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবস পালন কিংবা ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার বিরোধিতা করে। সেই সময়ই তিনি বলেছিলেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে এবং বাইরে ‘জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা’ করা হবে।

শুক্রবারের কর্মসূচিতেও সেই অবস্থানই বজায় রাখেন তিনি। একই সঙ্গে যাদবপুরের দেওয়ালে ‘রেড স্যালুট কিষেণজি’ লেখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, কিষেণজির মতো বিতর্কিত মাওবাদী নেতাকে নিয়ে এ ধরনের স্লোগান নতুন প্রজন্মের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

কিষেণজি থেকে ‘রেড স্যালুট’, উঠল জঙ্গলমহলের প্রসঙ্গ

কিষেণজির প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু নিজের রাজনৈতিক অতীতের কথাও তুলে ধরেন। নন্দীগ্রাম ও জঙ্গলমহলের আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, অতীতে মাওবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক লড়াই করেছেন।

যাদবপুরে ‘রেড স্যালুট কিষেণজি’ লেখা নিয়ে তাঁর আপত্তির মূল বক্তব্য ছিল, কোনও বিতর্কিত সশস্ত্র আন্দোলনের নেতাকে রোম্যান্টিসাইজ করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভুল রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছতে পারে।

‘বন্দে মাতরম’ কর্মসূচিতে ব্যাপক জমায়েত

শুক্রবারের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ১০ হাজার কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ পাঠ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে যাদবপুর থানা পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে জাতীয় পতাকা হাতে বহু মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিজেপি এবং এবিভিপি-র কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও কর্মসূচিতে যোগ দেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তাও ছিল কড়া। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি গেট সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রবেশপথ ব্যবহার করতে হয়েছে। মূল অনুষ্ঠানস্থলে বড় এলইডি স্ক্রিন বসানো হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের ‘বন্দে মাতরম’-এর কথা লেখা কাগজও দেওয়া হয়, যাতে সকলে একসঙ্গে গানটি গাইতে পারেন।

যাদবপুর নিয়ে আগে থেকেই আক্রমণাত্মক অবস্থান

সাম্প্রতিক ছাত্র সংঘর্ষের পর থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্য রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। গত ১৯ এবং ২০ অগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই ঘটনার পরই শুভেন্দু যাদবপুরে ‘জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা’র কথা বলেছিলেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হয় না, জাতীয় পতাকা উত্তোলনে আপত্তি রয়েছে এবং শিক্ষা দফতরের আধিকারিকদের প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সিসিটিভি বসানো নিয়েও তাঁর অভিযোগ ছিল। যদিও এই অভিযোগগুলির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে পাল্টা বক্তব্যও রয়েছে।

শুক্রবারের কর্মসূচির মাধ্যমে কার্যত সেই বিতর্কই আরও এক ধাপ এগোল। একদিকে হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’, অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ—সব মিলিয়ে যাদবপুর ফের রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

শুভেন্দুর এ দিনের বক্তব্যে স্পষ্ট, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে জাতীয়তাবাদ বনাম ‘আজাদি’ বিতর্কে তাঁর সরকার ও দল পিছু হটবে না। বরং আগামী দিনে এই ইস্যুকে আরও জোরালো ভাবে রাজনৈতিক মঞ্চে তুলে ধরা হবে—এমনই ইঙ্গিত মিলেছে তাঁর বক্তব্যে।


No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved