
নিউজ ডেস্ক: ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে প্রকাশ্য টানাপড়েনের পর শুক্রবারের তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের সমাবেশে দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য ছবি। কয়েক সপ্তাহ আগেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রকাশ্যেই বাক্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, দলের অন্দরে তাঁর সঙ্গে নেতৃত্বের সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায়। কিন্তু শুক্রবার ক্যাথিড্রাল রোডের সভামঞ্চে সেই জল্পনায় যেন অন্য মাত্রা যোগ হল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই কল্যাণকে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দিলেন। শুধু তাই নয়, বক্তব্য শুরুর আগে শ্রীরামপুরের সাংসদের লড়াইয়ের মনোভাবের প্রশংসাও করতে শোনা যায় তাঁকে।
তবে এ দিনের সভায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মূল সুর ছিল রাজনৈতিক এবং আইনি লড়াই। বিশেষ করে তৃণমূল ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দেওয়া বলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেই সাংসদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গেই বড় দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ওই ২০ জন সাংসদের পদ খারিজ করানো হবে। শুধু পদ খারিজ নয়, তাঁর দাবি অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আসনগুলিতে উপনির্বাচনের পরিস্থিতিও তৈরি হবে।
২১ জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে শুক্রবারের সভার একটি বিশেষ মিলও নজরে এসেছে। সেদিনও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য রাখছিলেন, সেই সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তব্য দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে তাঁকে থামতে বলেছিলেন দলনেত্রী—এমনটাই দাবি করা হয়েছিল। তার পরেই দু’জনের মধ্যে প্রকাশ্যে কথাকাটাকাটি হয় বলে রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছিল। রাগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে কল্যাণকে মঞ্চ ছাড়তেও দেখা গিয়েছিল বলে অভিযোগ।
কিন্তু শুক্রবার পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই আলাদা। ক্যাথিড্রাল রোডে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভায় কল্যাণ বক্তব্য শুরু করার সময় ফের মঞ্চে ওঠেন মমতা। এর মধ্যেই সভাস্থলের পাশ দিয়ে একটি গাড়ি ঢুকে পড়ায় সাময়িক ভাবে সভার কার্যক্রম থামিয়ে রাখতে হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে মমতা নিজেই কল্যাণকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে ২১ জুলাইয়ের ঘটনার তুলনায় এ দিনের মঞ্চে দু’জনের সম্পর্কের প্রকাশ্য ছবিটা ছিল যথেষ্ট ভিন্ন।
সম্ভবত সেই কারণেই বক্তব্যের শুরুতেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। তিনি জানান, দীর্ঘ বক্তৃতা করবেন না। তবে বক্তব্য যত এগোয়, ততই তাঁর কথায় রাজনৈতিক আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়ে। বিশেষ করে দলবদল এবং সাংসদ পদ সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গ সামনে এনে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি পিছিয়ে আসছেন না।
কল্যাণের দাবি, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দেওয়া ২০ জন সাংসদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, “এক বছরের মধ্যে ওই কুড়ি জন সাংসদের পদ খারিজ করে দেখাবোই।” একই সঙ্গে ওই আসনগুলিতে এক বছরের মধ্যে পুনর্নির্বাচন হওয়ার দাবিও করেন তিনি। যদিও এই বক্তব্যের বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ ভাবে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।
এ দিনের সভা থেকে বিরোধী শিবিরকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন কল্যাণ। বিরোধী দলনেতার পদ নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বিরোধী দলনেতার ভবিষ্যৎ নিয়েও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বক্তৃতায় তিনি বলেন, এক জন বিরোধী দলনেতাকে মুখ্যমন্ত্রী বসিয়েছিলেন—এমন দাবি করে সেই পদকেও তিনি ‘অস্থায়ী’ বলে কটাক্ষ করেন। একই সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীকেও ‘অস্থায়ী’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এখানেই থামেননি শ্রীরামপুরের সাংসদ। তৃণমূলের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে বলেন, ভয় দেখিয়ে তাঁকে পিছিয়ে দেওয়া যাবে না। তাঁর বক্তব্য, যতবার তাঁকে জেলে পাঠানো হবে, ততবার জেল থেকে বেরিয়ে এসে তিনি ফের তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কাজ করবেন। তাঁর কথায়, “ভয় পাওয়ার লোক আমরা নেই।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্যের বার্তাও দিতে চেয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে শুক্রবারের ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে মমতা-কল্যাণ সমীকরণের পরিবর্তিত প্রকাশ্য ছবি। ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছিল, তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দলীয় ছাত্র সংগঠনের বড় সভায় মমতার উপস্থিতিতে কল্যাণের বক্তব্য রাখা এবং দলনেত্রীর তরফে তাঁকে উৎসাহ দেওয়া রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূলের অন্দরে প্রকাশ্য মতপার্থক্য নতুন নয়। কিন্তু নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের পরেও কোনও নেতাকে ফের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। শুক্রবারের সভাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক দিকে মমতার তরফে কল্যাণকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি, অন্য দিকে কল্যাণের পাল্টা কড়া রাজনৈতিক বার্তা—দুই ঘটনাই দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে নতুন করে চর্চার সুযোগ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, ২১ জুলাইয়ের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর শুক্রবারের ছবি অনেকটাই আলাদা। মঞ্চে মমতার উপস্থিতি, তাঁরই উৎসাহে কল্যাণের বক্তব্য এবং তার পরেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে একের পর এক কড়া বার্তা—তৃণমূলের রাজনৈতিক মঞ্চে এ দিনের সমাবেশ তাই শুধুমাত্র ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠান হয়ে থাকল না। দলীয় রাজনীতি, সাংসদ পদ এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াই নিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments