
নিউজ ডেস্ক : ‘তুমি চিনা?’— প্রশ্নটা শুনেই গলা চড়িয়েছিল ছোট্ট মেয়েটি। বয়স অল্প, কিন্তু আত্মপরিচয় নিয়ে তার দৃঢ়তা অবাক করেছিল গোটা দেশকে। স্পষ্ট ভাষায় সে জানিয়েছিল, ‘আমরা ভারতীয়।’ অরুণাচল প্রদেশের সেই ছোট্ট টিঙ্কল সম্প্রতি একটি ভাইরাল ভিডিয়োর মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠে দেশজুড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষকে ‘চিনা’ বলে কটাক্ষ করার যে প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ওঠে, তার বিরুদ্ধে শিশুটির দৃঢ় অবস্থান প্রশংসা কুড়িয়েছিল সমাজমাধ্যমে। এবার সেই টিঙ্কলের সঙ্গেই ভিডিও কলে কথা বললেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু। ছোট্ট মেয়েটিকে আশ্বস্ত করে তিনি জানালেন, গোটা দেশ তার পাশে রয়েছে।
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের অনুষ্ঠানে ভিডিও কলের মাধ্যমে টিঙ্কলের সঙ্গে রিজিজুর পরিচয় করানো হয়। সেখানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে কখনও ইংরেজি, কখনও আবার হিন্দিতে শিশুটির সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। স্বাভাবিক ভাবেই টিঙ্কলের সঙ্গে কথোপকথন ছিল বেশ সরল এবং আন্তরিক। মন্ত্রী জানতে চান, তার মা-বাবা কোথায় রয়েছেন। এমনকি টিঙ্কলের মায়ের সঙ্গে কথাও বলতে চান তিনি।
ভিডিয়োয় রিজিজুকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার মা কোথায়? আমাকে ওঁর ছবি দেখাও। তোমার বাবা কোথায়?’ তবে বয়স কম হওয়ায় মন্ত্রীর কথার বেশির ভাগটাই হয়তো ঠিক ভাবে বুঝতে পারেনি টিঙ্কল। ভিডিও কলের সময় তাই তাকে বেশির ভাগ সময় নীরবই থাকতে দেখা যায়। তার সেই স্বাভাবিক শিশুসুলভ আচরণও নজর কেড়েছে।
কথোপকথনের শেষ দিকে টিঙ্কলকে রিজিজু বলেন, বাড়িতে গিয়ে যেন সে তার মাকে জানায় যে ‘রিজিজু আঙ্কল’ ফোন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, যে বা যারা তাকে ‘চিনা’ বলে উত্যক্ত করেছিল, তাদের বিষয়েও জানতে চান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি আসে তার পরেই। টিঙ্কলকে উদ্দেশ করে রিজিজু বলেন, গোটা ভারত তাকে ভালবাসে এবং তার পাশে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কথায়, এখন গোটা দেশ টিঙ্কলকে চিনে ফেলেছে। সে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে—এই বিষয়টি সে জানে কি না, মজা করেই শিশুটির কাছে জানতে চান রিজিজু। মন্ত্রীর এই কথোপকথনের ভিডিয়োও ইতিমধ্যে সমাজমাধ্যমে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
টিঙ্কলকে ঘিরে এই আলোচনার সূত্রপাত অবশ্য আরও আগে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় দেখা যায়, কেউ একজন শিশুটিকে প্রশ্ন করছেন, সে ‘চিনা’ কি না। প্রশ্নটি শুনেই প্রতিবাদ করে ওঠে টিঙ্কল। তার কথায় স্পষ্ট ছিল অভিমান এবং ক্ষোভ। হিন্দিতে সে জানায়, তারা ভারতীয়। তাদের ‘চিনা’ বলা হলে তাদের খারাপ লাগে, রাগ হয়। তার পরিচয় যেন ভারতীয় হিসাবেই দেওয়া হয়—সেটিই ছিল শিশুটির মূল বক্তব্য।
এর পর নিজের পরিচয় আরও স্পষ্ট করে টিঙ্কল জানায়, তারা ইটানগরে থাকে। কয়েকটি সাধারণ বাক্যেই সে যে বার্তা দিয়েছিল, তা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ইনস্টাগ্রাম এবং এক্স-সহ বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে। বয়সে ছোট হলেও নিজের পরিচয় নিয়ে তার এমন দৃঢ় অবস্থান অনেকের নজর কেড়ে নেয়।
বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, দেশের অন্য প্রান্তে তাঁদের চেহারা বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানা ধরনের কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় তাঁদের বিদেশি বা ‘চিনা’ বলে বিদ্রূপ করার ঘটনাও সামনে আসে। এই ধরনের মন্তব্য যে কেবল মজা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট মানুষের আত্মপরিচয় ও মর্যাদায় আঘাত করতে পারে—টিঙ্কলের ঘটনা সেই বিষয়টিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
টিঙ্কলের প্রতিবাদ তাই শুধুমাত্র একটি শিশুর রাগের প্রকাশ হিসেবে দেখেননি নেটিজেনদের একাংশ। বরং অনেকেই মনে করেছেন, তার কয়েকটি সরল বাক্যের মধ্যে রয়েছে নিজের দেশ ও পরিচয়ের প্রতি গভীর আত্মবিশ্বাস। সে যে উত্তর দিয়েছে, তা যেন উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতারও প্রতিধ্বনি।
এই কারণেই টিঙ্কলের ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পর সমাজমাধ্যমে তার প্রশংসা শুরু হয়। বয়সে ছোট হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস দেখানোর জন্য তাকে কুর্নিশ জানান অনেকে। সেই ভাইরাল হওয়া শিশুটির সঙ্গে এবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সরাসরি কথা বলা বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
রিজিজুর সঙ্গে টিঙ্কলের এই ভিডিও কলের মধ্যে তাই শুধুমাত্র এক মন্ত্রী ও শিশুর সৌজন্য সাক্ষাৎ নেই। এর মধ্যে রয়েছে দেশের বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক পরিচয় এবং প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের আত্মপরিচয়ের প্রতি সম্মানের একটি বার্তাও। ছোট্ট টিঙ্কল হয়তো সেই অর্থে কোনও বড় বক্তৃতা দেয়নি। কিন্তু ‘আমরা ভারতীয়’—তার এই সহজ কথাটিই যে কতটা শক্তিশালী বার্তা হয়ে উঠতে পারে, ভাইরাল ভিডিয়োর প্রতিক্রিয়াই তার প্রমাণ।
টিঙ্কলের উদ্দেশে রিজিজুর আশ্বাস—‘গোটা ভারত তোমায় ভালবাসে’—সেই বার্তাকেই যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। দেশের এক প্রান্তের ছোট্ট মেয়ের কণ্ঠে উচ্চারিত আত্মপরিচয়ের দাবি পৌঁছে গেল জাতীয় স্তরে। আর সেই কারণেই টিঙ্কলকে ঘিরে আগ্রহ এখনও থামেনি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments