Last updated: August 23rd, 2026 at 12:55 pm

নিউজ ডেস্ক: বহুমূল্যের স্মার্টফোন কেনার উন্মাদনা যে এভাবে একটি গোটা পরিবারকে নিঃশেষ করে দিতে পারে, তা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি প্রতিবেশীরা। মাত্র একটা অ্যাপল আইফোনের মাসিক ইএমআই (EMI) মেটানোকে কেন্দ্র করে তুলকালাম অশান্তি শুরু হয়েছিল ঘরে। সেই বিবাদের জের শেষ পর্যন্ত গড়াল চরম ট্র্যাজেডিতে। পাহাড়ি খাঁদ থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হল একই পরিবারের তিন সদস্যের। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজীনগর এলাকায়। মৃতের তালিকায় রয়েছেন ১৮ বছরের এক তরুণ এবং তাঁর বাবা-মা। এই ঘটনায় সমগ্র এলাকায় তীব্র শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, মৃত তরুণের নাম কুনাল (১৮)। সম্প্রতি একটি দামী আইফোন কিনেছিল সে। কিন্তু সেই ফোনের প্রতি মাসের কিস্তি বা ইএমআই কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে টানা বিবাদ চলছিল। কুনাল তাঁর বাবা-মায়ের কাছে ইএমআই-এর টাকা দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক টানাটানির কারণে বাবা-মা সেই অতিরিক্ত খরচের বোঝা বহনে অসমর্থ ছিলেন। এই নিয়েই ঘটনার দিন কুনালের সঙ্গে তাঁর বাবা-মায়ের তুমুল বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
পারিবারিক অশান্তি চরমে পৌঁছলে মারাত্মক এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কুনাল। রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে সোজা চলে যায় কাছের একটি উঁচু পাহাড়ি এলাকায়। খাঁদের একেবারে প্রান্তে গিয়ে আত্মঘাতী হওয়ার হুঁশিয়ারি দিতে থাকে সে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখতে পেয়ে দ্রুত কুনালের পরিবার এবং পুলিশ প্রশাসনকে খবর দেন। তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কুনালের বাবা-মা, স্থানীয় থানা পুলিশ এবং দমকল বাহিনীর একটি দল।
শুরু হয় কুনালকে উদ্ধার করার দীর্ঘ উদ্ধারকার্য। খাঁদের বিপজ্জনক কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সমতলে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকেন পুলিশ ও দমকলকর্মীরা। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন কুনালের অসহায় বাবা-মা। প্রায় দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ধরে চলে এই রুদ্ধশ্বাস নাটক। কিন্তু কুনাল নিজের জেদে অনড় ছিল। পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হয়ে উঠলে এবং তরুণের পা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আর স্থির থাকতে পারেননি তাঁর বাবা। উদ্ধারকারীদের অপেক্ষা না করে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ছেলেকে বাঁচাতে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। খাঁদের কিনারে পৌঁছে ছেলেকে টেনে নিরাপদে তুলে আনার চেষ্টা করেন তিনি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, টানাটানির মাঝেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন দু’জনে। আচমকাই পা পিছলে অতল খাঁদে তলিয়ে যান কুনাল ও তাঁর বাবা। চোখের সামনে স্বামী ও সন্তানকে পাহাড়ি খাঁদ থেকে নিচে পড়ে যেতে দেখে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন কুনালের মা-ও। হাহাকার করে উঠে তিনিও দুর্ঘটনাবশত নিচে পড়ে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি।
পলকের মধ্যে তিনজনই পাহাড়ের কয়েকশো ফুট নিচে পাথুরে জমিতে আছড়ে পড়েন। দমকল ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত নিচে নেমে তিনজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ছত্রপতি সম্ভাজীনগর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ইএমআই সংক্রান্ত পারিবারিক কলহের বিষয়টিই প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এর নেপথ্যে অন্য কোনো মানসিক বা সামাজিক চাপ ছিল কি না, তাও পুলিশ গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছে। মৃতদেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। প্রযুক্তির প্রতি অন্ধ আকর্ষণ এবং বিলাসিতার চাহিদা যে কীভাবে একটি সুন্দর পরিবারকে মুহূর্তে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিল, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments